॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৪৭ ॥

সঞ্জয় উবাচ—
এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ ।
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ ॥ ৪৭ ॥

সরল ভাবার্থ

সঞ্জয় বললেন— রণাঙ্গনে এই কথা বলে শোকাকুল চিত্তে অর্জুন তাঁর ধনুক ও বাণ ত্যাগ করে রথের বসার স্থানে বসে পড়লেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি হলো শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের শেষ শ্লোক। এখানে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে অর্জুনের চূড়ান্ত অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন। অর্জুন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তিনি কেবল মৌখিকভাবে যুদ্ধ ত্যাগ করেননি, বরং তাঁর ধনুক ও বাণ (সশরং চাপং) শরীর থেকে ছুঁড়ে ফেলেছেন এবং রথের রথোপস্থে (বসার স্থানে) ধপ করে বসে পড়েছেন। তাঁর মন এখন 'শোকসংবিগ্ন'—অর্থাৎ শোকের প্রাবল্যে তাঁর বিচারবুদ্ধি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেছে।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে এটি হলো 'বিষাদ যোগ'-এর পূর্ণতা। অর্জুনের এই বিষাদ সাধারণ মানুষের ডিপ্রেশন নয়, বরং এটি হলো সত্যকে জানার জন্য একটি শূন্যতা। যখন মানুষের পুরানো ধ্যান-ধারণা ভেঙে পড়ে এবং সে নিজেকে পুরোপুরি অসহায় মনে করে, তখনই সে ভগবানের শক্তির জন্য প্রস্তুত হয়। অর্জুন এখানে তাঁর সমস্ত দম্ভ, বীরত্ব এবং কৌশল বিসর্জন দিয়েছেন। তিনি এখন আর রথের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অহংকারী যোদ্ধা নন, তিনি হলেন এক আর্ত শিষ্য।

এই প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি আমাদের শেখায় যে, জীবনের ঝঞ্ঝায় যখন আমাদের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, যখন আমাদের নিজের বুদ্ধি আর কাজ করে না, তখনই আমরা পরমেশ্বরের বাণীর জন্য যোগ্য হয়ে উঠি। অর্জুনের এই স্তব্ধতা আসলে এক বিশাল ঝড়ের আগের শান্তি। এই স্তব্ধতার পরেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মুখ খুলবেন এবং অর্জুন তথা পুরো মানবজাতির জন্য অমর বাণী 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা' দান করবেন। এই শ্লোকটি হলো অর্জুনের অহংকারের সমাপ্তি এবং তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রার সূচনাবিন্দু।


[ছবি: দুই বিশাল সেনাদলের মাঝখানে রথের চাকার কাছে মাথা নিচু করে বসে থাকা অর্জুন এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোতির্ময় শ্রীকৃষ্ণ।]