॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ২৬ ॥

তত্রাপশ্যৎ স্থিতান পার্থঃ পিতৃনথ পিতামহান্ ।
আচার্যান মাতুলান ভ্রাতৃন পুত্রান পৌত্রান সখীংস্তথা ॥ ২৬ ॥

সরল ভাবার্থ

অর্জুন সেই দুই দলের সেনাবাহিনীর মধ্যে অবস্থানকারী পিতৃব্যদের, পিতামহদের, আচার্যদের, মাতুলদের, ভাইদের, পুত্রদের, পৌত্রদের এবং মিত্রদের দেখতে পেলেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন যখন কুরুক্ষেত্রের রণভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করলেন, তখন তিনি কোনো 'শত্রু' দেখতে পেলেন না। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিশাল পারিবারিক মিলনমেলা। তিনি দেখলেন পিতৃব্যদের (ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর), পিতামহ ভীষ্মকে, আচার্য দ্রোণ ও কৃপকে। এছাড়া শল্যের মতো মাতুল, দুর্যোধনের মতো ভাই এবং লক্ষ্মণের মতো পৌত্রদের তিনি লক্ষ্য করলেন। ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিচারে এই শ্লোকটি 'মায়ার' প্রবল প্রভাবকে নির্দেশ করে। অর্জুন এখানে আদর্শবাদী যোদ্ধা থেকে একজন সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষে পরিণত হলেন।

এতক্ষণ অর্জুন একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধের জন্য উন্মত্ত ছিলেন, কিন্তু যখনই তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে সামনে তাকালেন, তাঁর বীরত্বের আবরণ খসে পড়ল। তিনি ভুলে গেলেন যে এই মানুষগুলোই পাঞ্চালীকে অপমান করেছে, এই মানুষগুলোই পাণ্ডবদের বিষ খাইয়ে মারার চেষ্টা করেছে। মায়া মানুষের স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করে দেয় এবং কেবল বর্তমানের আবেগকেই বড় করে দেখায়। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের কঠিনতম সময়েও মায়া আমাদের কর্তব্যপথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। সম্পর্কের এই বাঁধন অত্যন্ত শক্তিশালী, যা অনেক সময় মানুষের ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধকে স্তব্ধ করে দেয়। অর্জুন যে সবাইকে আলাদা আলাদা সম্পর্কের নামে (পিতৃন, পিতামহান) দেখছেন, তা প্রমাণ করে যে তাঁর মনের ভেতরের মমত্ববোধ জাগ্রত হয়েছে এবং তিনি যুদ্ধের চেয়ে সম্পর্কের বন্ধনকেই বড় করে দেখতে শুরু করেছেন। এই দেখার মাধ্যমেই তাঁর বীরত্বের বিনাশ এবং আধ্যাত্মিক সংকটের সূচনা হলো।


[ছবি: অর্জুন রথের ওপর স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাঁর চোখের সামনে কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে পিতামহ ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের মুখ ভেসে উঠছে।]