॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ২৭ ॥

শ্বশুরান সুহৃদশ্চৈব সেনয়োরুভয়োরপি ।
তান সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্বান বন্ধুনবস্থিতান ॥ ২৭ ॥

সরল ভাবার্থ

শ্বশুরদের এবং সুহৃদদের উভয় সৈন্যদলে অবস্থান করতে দেখে কুন্তীপুত্র অর্জুন অত্যন্ত করুণাবিষ্ট হলেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুন কেবল কৌরব পক্ষেই নয়, বরং নিজের পাণ্ডব পক্ষেই অনেক হিতৈষী ও শ্বশুরকুলকে (যেমন দ্রুপদ) দেখতে পেলেন। এই শ্লোকে অর্জুনকে 'কৌন্তেয়' বলে সম্বোধন করা হয়েছে। কুন্তী ছিলেন এক ধৈর্যশীল ও দুঃখী মা, তাঁর পুত্র হিসেবে অর্জুনের মনেও সেই কোমলতা ও করুণার উদয় হলো। এই করুণা কিন্তু সাধারণ দয়া নয়, এটি হলো 'মোহজনিত শোক'। যখন কোনো ব্যক্তি সত্যকে না বুঝে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে দুঃখ পায়, তখন তাকে বলা হয় মোহ।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্জুনের এই অবস্থা হলো মানুষের চেতনার এক সংকটকাল। তিনি দেখছেন যে জয় বা পরাজয় যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর 'বন্ধু' বা আত্মীয়রাই মারা যাবেন। এই 'বন্ধুনবস্থিতান' বা আত্মীয়দের উপস্থিতি অর্জুনের যুদ্ধ করার মানসিক শক্তিকে ভেতর থেকে চূর্ণ করে দিল। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের শেখায় যে, যখন আমরা কোনো কাজ 'আমি' এবং 'আমার' (যেমন আমার আত্মীয়, আমার বন্ধু) এই বোধ থেকে করি, তখনই দুঃখ আসে। অর্জুন এখানে ধর্মযুদ্ধকে একটি পারিবারিক বিবাদ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে আততায়ী বা অন্যায়কারীর কোনো আত্মীয়তা থাকতে নেই। এই শ্লোকে তাঁর করুণাবিষ্ট হওয়া আসলে তাঁর ক্ষত্রিয় ধর্মের পরিপন্থী ছিল। বীরের কাজ হলো অন্যায়ের বিনাশ করা, কিন্তু অর্জুনের মন এখন তর্কের জালে জড়িয়ে পড়েছে। এই মোহ তাঁকে এতটাই আচ্ছন্ন করল যে তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতে শুরু করলেন। এই করুণাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের চরণে পূর্ণ আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে যাবে।


[ছবি: অর্জুনের মুখমণ্ডল ম্লান হয়ে গেছে, তিনি অত্যন্ত করুণ দৃষ্টিতে দুই শিবিরের যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।]