॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ২৮ ॥

কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদিন্নিদমব্রবীত ।
দৃষ্ট্বেমান স্বজনান কৃষ্ণ যুযুতসুন সমবস্থিতান ॥ ২৮ ॥

সরল ভাবার্থ

অত্যন্ত করুণায় আচ্ছন্ন হয়ে বিষাদগ্রস্ত মনে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বললেন— হে কৃষ্ণ! এই যুদ্ধাভিলাষী স্বজনদের সম্মুখে উপস্থিত দেখে আমার শরীর অবসন্ন হচ্ছে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি থেকে অর্জুনের মানসিক কষ্টের শারীরিক প্রকাশ শুরু হয়। অর্জুন এখানে শ্রীকৃষ্ণকে 'কৃষ্ণ' বলে সম্বোধন করেছেন। কৃষ্ণ মানে যিনি আকর্ষণ করেন। অর্জুন তাঁর মনের সবটুকু ভার শ্রীকৃষ্ণের ওপর অর্পণ করার প্রথম পদক্ষেপ নিলেন। তিনি বলছেন যে তাঁর সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা 'শত্রু' নয়, বরং 'স্বজন'। এই 'স্বজন' শব্দটিই হলো তাঁর সকল কষ্টের মূল। যখন মন কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে, তখন তাকে ত্যাগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ধর্মীয় বিচারে, অর্জুনের এই 'বিষাদ' কোনো সাধারণ অবসাদ নয়, একে বলা হয় 'বিষাদ যোগ'। অর্থাৎ দুঃখের মাধ্যমেই তিনি পরমেশ্বরের সাথে যুক্ত হতে শুরু করেছেন। অর্জুন যখন দেখলেন তাঁর আত্মীয়রা যুদ্ধের জন্য উদগ্রীব (যুযুতসুন), তখন তাঁর বিবেক তাঁকে দংশন করতে শুরু করল। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলেন—এই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া রাজ্য কি সত্যই সুখের হবে? মানুষের জীবনেও যখন আমরা ভুল পথে পা বাড়াই বা কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন আমাদের শরীর ও মন অবশ হয়ে আসে। অর্জুনের এই অবস্থা প্রমাণ করে যে তিনি একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। কিন্তু রণক্ষেত্রে একজন যোদ্ধার এই সংবেদনশীলতা তাঁর দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়। নিজের দুর্বলতা স্বীকার করলেই কেবল পরম করুণাময় শ্রীকৃষ্ণের সাহায্য পাওয়া সম্ভব। এই আর্তনাদই অর্জুনকে তাঁর পূর্ববর্তী দম্ভ থেকে মুক্ত করতে শুরু করেছে।


[ছবি: অর্জুন রথের বসার জায়গায় বসে পড়ছেন, তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম এবং হাত দুটো কাঁপছে।]