সরল ভাবার্থ
বর্ণসংকর কুলনাশকদের এবং সমগ্র কুলের নরকের কারণ হয়। এই কুলের পিতৃপুরুষদের পিণ্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পায়, ফলে তাঁরাও নরকে পতিত হন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
অর্জুন এখানে সনাতন ধর্মের 'পিতৃপুরুষদের তর্পণ' এবং 'পিণ্ডদান' প্রথার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বর্ণসংকর প্রজন্মের মানুষেরা তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় আচার পালন করবে না। এর ফলে পিতৃপুরুষরা স্বর্গের সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে নরকে পতিত হবেন। হিন্দু ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে, বংশের ধারা বজায় রাখা এবং মৃত পিতৃপুরুষদের জন্য তর্পণ করা বংশধরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব। অর্জুন ভাবছেন যে কুলক্ষয়ের মাধ্যমে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদেরও অমঙ্গল করছেন।
এই শ্লোকটি অর্জুনের সংস্কার ও আচারের প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশ করে। তিনি মনে করছেন যে যুদ্ধ করলে তিনি নরকগামী হবেন কারণ তিনি তাঁর বংশের পবিত্রতা নষ্ট করছেন। কিন্তু অর্জুন একটি সূক্ষ্ম সত্য এড়িয়ে যাচ্ছেন—ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং সেখানে উপস্থিত। যার সাথে পরমেশ্বর আছেন, তাঁর বংশ কোনোদিনও অন্ধকারে যেতে পারে না। অর্জুন এখানে 'দেহ' ও 'বংশ' নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত, কিন্তু 'আত্মা' নিয়ে তাঁর কোনো চিন্তা নেই।
ধর্মীয় বিচারে, পিণ্ডদান বা তর্পণ হলো এক ধরণের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। অর্জুন মনে করছেন যুদ্ধ হলে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ হারিয়ে যাবে। তিনি নিজেকে একজন রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবছেন। মানুষের মনে যখন ভয় ঢুকে যায়, তখন সে এই ধরণের বিমূর্ত ও কাল্পনিক যুক্তির আশ্রয় নেয়। অর্জুনের এই মানসিক অবস্থা আমাদের শেখায় যে, মায়া মানুষকে এতটাই গ্রাস করে যে সে স্বয়ং ঈশ্বরের ইচ্ছাকে শাস্ত্রীয় আচারের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে ভয় পায়।
[ছবি: প্রতীকী ভাবে আকাশ থেকে পিতৃপুরুষদের বিষণ্ণ মুখে নিচে তাকিয়ে থাকার এক দৃশ্য অর্জুনের কল্পনায় ভেসে উঠছে।]