॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ১৩ ॥

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবত্ ॥ ১৩ ॥

সরল ভাবার্থ

তারপর হঠাৎ করেই চারদিকে অসংখ্য শঙ্খ, ভেরী, দামামা, ঢোল ও রণশিঙা একসাথে বেজে উঠল। সেই সম্মিলিত শব্দ এক তুমুল কোলাহলের সৃষ্টি করল।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

ভীষ্ম যখন শঙ্খ বাজালেন, তখন তাঁর নির্দেশে পুরো কৌরব বাহিনী যেন জেগে উঠল। হাজার হাজার বাদ্যযন্ত্র একসাথে বেজে ওঠায় রণক্ষেত্রে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক—এই সবই ছিল প্রাচীন যুদ্ধের রণবাদ্য। এই সম্মিলিত আওয়াজ আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এই 'তুমুল' শব্দ কৌরবদের দম্ভের প্রতীক। তারা শব্দ দিয়ে পাণ্ডবদের ভয় দেখাতে চেয়েছিল।

এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, অনেক সময় অধর্ম খুব উচ্চস্বরে কথা বলে। আসুরিক শক্তি সবসময় কোলাহল এবং বাহ্যিক আড়ম্বরের মাধ্যমে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু কেবল শব্দ দিয়ে কি যুদ্ধ জয় করা যায়? কৌরবদের এই রণধ্বনি ধৃতরাষ্ট্রের মনে হয়তো কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছিল, কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিল এর বিপরীতে। এই তুমুল শব্দ আসলে আসন্ন ধ্বংসের একটি আর্তনাদ। যখন মানুষের বিবেক মরে যায়, তখন সে কেবল যান্ত্রিক শব্দের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করতে চায়। কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গন তখন ধুলো আর শব্দে একাকার। এই কোলাহল বুঝিয়ে দিচ্ছে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমরা আমাদের জীবনেও যখন অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ি, তখন চারদিকের কোলাহল আমাদের বিভ্রান্ত করে। কিন্তু গীতা আমাদের শেখায় সেই কোলাহলের মাঝেও শান্ত থেকে ঈশ্বরের কথা শোনা। কৌরবদের এই শব্দ পাণ্ডবদের শঙ্খধ্বনির মতো দিব্য ছিল না, এটি ছিল কেবল একটি কর্কশ যুদ্ধের আওয়াজ।


[ছবি: রণক্ষেত্রে কৌরব বাহিনীর শত শত বাদক দল ঢোল ও রণশিঙা বাজাচ্ছে, চারদিকে ধুলো উড়ছে এবং ঘোড়াগুলো অস্থির হয়ে উঠছে।]