॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ২ ॥
সঞ্জয় উবাচ ।
দৃষ্ট্বা তু পাণ্ডবানীকং ব্যূঢ়ং দুর্যোধনস্তদা ।
আচার্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীত্ ॥ ২ ॥
সরল ভাবার্থ: সঞ্জয় বললেন— তখন রাজা দুর্যোধন পাণ্ডবদের ব্যুহবদ্ধ সৈন্যদল দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে এই কথা বললেন।
ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ও গভীর ব্যাখ্যা:
ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করছেন। দুর্যোধন যদিও বড় সৈন্যদলের অধিপতি ছিলেন, কিন্তু পাণ্ডবদের সুশৃঙ্খল 'ব্যুহ' বা সৈন্যসজ্জা দেখে তাঁর মনে ভয়ের উদয় হয়েছিল। এটিই অধর্মের লক্ষণ—অধর্মের পথে অনেক শক্তি থাকলেও মনে শান্তি থাকে না। দুর্যোধন সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে না গিয়ে তাঁর গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে গেলেন। এখানে তাঁকে 'রাজা' বলে সম্বোধন করা হয়েছে কারণ তিনি তখন কার্যত হস্তিনাপুরের শাসক।
ধর্মীয় বিচারে দুর্যোধন হলেন 'অহংকারের' প্রতীক। তাঁর এই দ্রোণাচার্যের কাছে যাওয়া কেবল উপদেশের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল একটি রাজনৈতিক চাল। তিনি তাঁর গুরুকে স্মরণ করিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন যে, পাণ্ডবরাও তাঁর শিষ্য এবং তাদের প্রতি যেন দ্রোণাচার্যের কোনো দুর্বলতা না থাকে। যখন মানুষের মনে ভয় জন্মায়, তখন সে অন্যের ওপর দোষারোপ বা অন্যদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। দুর্যোধন জানতেন যে পাণ্ডবদের পক্ষে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আছেন, তাই তাঁর বাহ্যিক আস্ফালনের আড়ালে এক গভীর অস্থিরতা ছিল। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, মানুষ যখন সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সে বাইরের সাজসজ্জা বা সৈন্যবল দিয়ে নিজের ভেতরের দুর্বলতা ঢাকতে চায়। গুরুর কাছে যাওয়ার সময় বিনয় থাকা প্রয়োজন, কিন্তু দুর্যোধনের মনে ছিল কূটনীতি। আধ্যাত্মিক জীবনে এটি এক বড় শিক্ষা—যেকোনো যুদ্ধের শুরুতে নিজের ভেতরের অস্থিরতা ও অহংকারকে চিনে নেওয়া জরুরি।
[ছবি: কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে কৌরব ও পাণ্ডবদের বিশাল বাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। রথে চড়ে দুর্যোধন গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে কথা বলছেন।]