॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ১৭ ॥

কাশ্যশ্চ পরমেম্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ ।
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্য়কিশ্চাপরাজিতঃ ॥ ১৭ ॥

সরল ভাবার্থ

পরম ধনুর্ধর কাশিরাজ, মহারথী শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন, রাজা বিরাট এবং অপরাজেয় সাত্যকি—তাঁরা প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে নিজ নিজ শঙ্খ বাজালেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

কুরুক্ষেত্রের এই রণাঙ্গনে পাণ্ডবদের পক্ষে যারা সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কেবল বীর নন, বরং তাঁরা ছিলেন সত্য ও ধর্মের ধারক। এই শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে সেই সব মহারথীদের নাম বলছেন যারা কৌরবদের অজেয় অহংকারকে চূর্ণ করার ক্ষমতা রাখেন। পরম ধনুর্ধর কাশিরাজ ছিলেন আধ্যাত্মিক ও সামরিক শক্তির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। শিখণ্ডীর নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ তিনি ছিলেন ধর্মের সেই গূঢ় রহস্যের প্রতীক যেখানে নিয়তি নিজের হাতে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। শিখণ্ডীই ছিলেন পিতামহ ভীষ্মের পতনের প্রধান কারণ, যা নির্দেশ করে যে অন্যায়ভাবে কাউকে রক্ষা করলে পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে।

ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন দ্রোণাচার্যের হন্তারক হিসেবে যজ্ঞ থেকে উৎপন্ন হওয়া বীর। এটি প্রমাণ করে যে, যখন পৃথিবীতে অধর্মের ভার বেড়ে যায়, তখন প্রকৃতি নিজেই শোধ নেওয়ার জন্য বীরদের সৃষ্টি করে। রাজা বিরাট এবং সাত্যকি ছিলেন অর্জুনের অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রীকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্ত। সাত্যকিকে এখানে 'অপরাজিত' বলা হয়েছে কারণ যার অন্তরে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিরাজমান, তাকে এই ত্রিভুবনে কেউ পরাজিত করতে পারে না। কৌরবদের ১১ অক্ষৌহিণী সৈন্যের বিপরীতে পাণ্ডবদের এই বীরেরা সংখ্যায় কম হলেও তেজস্বিতায় ছিলেন বহুগুণ এগিয়ে। তাঁদের শঙ্খধ্বনি কেবল শব্দ ছিল না, তা ছিল আসুরিক শক্তির ধ্বংসের আগাম ঘোষণা। ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, যখন আমরা ন্যায়ের পথে থাকি, তখন আমাদের সাথে এমন সব শক্তির সমাবেশ ঘটে যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও শেষ পর্যন্ত অসাধ্য সাধন করে। এই বীরদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ শঙ্খ বাজিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পান না বরং সত্যের জন্য আত্মাহুতি দিতেও প্রস্তুত।


[ছবি: রথারূঢ় বীর সাত্যকি এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁদের বিশাল ধনুক নিয়ে শঙ্খ বাজাচ্ছেন, চারদিকে পাণ্ডব সৈন্যদলের উদ্দীপনা দৃশ্যমান।]