॥ অধ্যায় ১, শ্লোক ৩০ ॥

গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাৎ ত্বক্চৈব পরিদহ্যতে ।
ন চ শক্নোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ ॥ ৩০ ॥

সরল ভাবার্থ

আমার হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুক খসে পড়ছে, ত্বক জ্বালা করছে, আমি আর স্থির থাকতে পারছি না এবং আমার মন যেন ভ্রমণ করছে (ঘুরছে)।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুনের হাতের যে গাণ্ডীব ধনুক ছিল তাঁর অহংকার ও বীরত্বের প্রতীক, আজ তা তাঁর অবশ হাত থেকে খসে পড়ছে। এটি কেবল একটি ধনুকের পতন নয়, এটি হলো অর্জুনের ক্ষত্রিয় ধর্মের সাময়িক পতন। তাঁর ত্বক বা চামড়া যেন জ্বলে যাচ্ছে (পরিদহ্যতে), যা তীব্র মানসিক দহনের লক্ষণ। তিনি রথের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না এবং তাঁর মন ভ্রমগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অর্জুন এখন এক চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

ধর্মীয় তত্ত্বে একে বলা হয় 'বুদ্ধিনাশ'। যখন মোহ চরমে পৌঁছায়, তখন মানুষের বিচারবুদ্ধি কাজ করে না। অর্জুনের গাণ্ডীব ধনুকটি ছিল অগ্নিদেবের দেওয়া দিব্য অস্ত্র, কিন্তু মনের জোর না থাকলে কোনো দিব্য অস্ত্রই কাজে লাগে না। গাণ্ডীবের খসে পড়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—আধ্যাত্মিক শক্তির ভিত্তি না থাকলে বাইরের কোনো হাতিয়ারই আমাদের রক্ষা করতে পারে না। অর্জুনের মন 'ভ্রমতীব' বা ঘুরছে কারণ তিনি কৌরবদের অন্যায় ভুলে গিয়ে কেবল তাদের সাথে নিজের সম্পর্কের কথাই ভাবছেন। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, সাংসারিক জ্ঞান এবং মায়া মানুষকে কত দ্রুত শূন্য করে দিতে পারে। এই অসহ্য দহনই তাঁকে শেষ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণের জ্ঞানালোকে শুদ্ধ করবে। অর্জুনের এই অস্থিরতা আসলে তাঁর পুনর্জন্মের আগের প্রসববেদনা।


[ছবি: অর্জুনের হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুকটি রথের মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে এবং তিনি দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরছেন।]