লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো ॥ ১১.৩০ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে বিষ্ণো! আপনি আপনার প্রজ্জ্বলিত মুখসমূহের দ্বারা সমস্ত জগতকে গ্রাস করতে করতে বারবার জিহ্বা লেহন করছেন। আপনার সেই উগ্র জ্যোতিপুঞ্জ সমগ্র জগতকে তেজে পরিপূর্ণ করে প্রখরভাবে দগ্ধ করছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
এই শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের সংহারক রূপের এক চরম ও বিভীষিকাময় বর্ণনা। অর্জুন দেখছেন যে কৃষ্ণ কেবল গ্রাস করছেন না, তিনি 'লেলিহ্যসে' অর্থাৎ জিভ দিয়ে চাটছেন বা তৃপ্তির সাথে আস্বাদন করছেন। এটি একটি অত্যন্ত ভয়ংকর দৃশ্য। যখন কেউ কোনো কিছু খুব স্বাদের সাথে খায়, তখন সে যেমন জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে, কৃষ্ণও তেমনি সমগ্র জগতকে গ্রাস করার সময় তৃপ্তি অনুভব করছেন। এখানে 'সমগ্রান্ লোকান্' মানে কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। জগতের প্রতিটি কণা, প্রতিটি জীব কৃষ্ণের সেই লেলিহান অগ্নিশিখার মতো জিহ্বার কবলে।
অর্জুন দেখছেন যে কৃষ্ণের এই উগ্র তেজ (তেজোভিরাপূর্য) সমগ্র জগতকে ভরে ফেলেছে। 'প্রতপন্তি' মানে দগ্ধ করা বা জ্বালিয়ে দেওয়া। এই আলো কোনো শান্তির আলো নয়, এটি হলো প্রলয়ের আগুন যা সবকিছুকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। অর্জুন আবারও তাঁকে 'বিষ্ণো' বলে সম্বোধন করছেন। বিষ্ণু যিনি এক সময় জগতকে পালন করতেন, আজ তিনিই জগতকে গ্রাস করছেন। এই বৈপরীত্যটি অর্জুনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন যে এই মহাবিশ্ব একটি বিশাল যজ্ঞকুণ্ড, যেখানে স্বয়ং ঈশ্বরই যজ্ঞকর্তা এবং তিনিই আহুতি গ্রহণ করছেন।
এই শ্লোকটি কাল বা সময়ের ক্ষুধার্ত রূপকে প্রকাশ করে। সময় যেমন সবকিছুকে ধীরে ধীরে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে এবং আরও খাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে, কৃষ্ণও তেমনি কালের রূপ ধারণ করেছেন। অর্জুন দেখছেন কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রটি সেই বিশাল আগুনের একটি ছোট শিখা মাত্র। এই দর্শনটি অর্জুনকে এক পরম গাম্ভীর্য প্রদান করছে। তিনি বুঝতে পারছেন যে জীবনের সব সৌন্দর্য, সব বীরত্ব আর সব অহংকার শেষ পর্যন্ত এই এক আগুনের পেটে গিয়েই শেষ হবে। এই শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্বের নশ্বরতাকে এক নিষ্ঠুর সত্য হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। অর্জুন এখন সেই পরম শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছেন এবং জানতে চাইছেন—কে এই উগ্র রূপী পরমেশ্বর এবং তাঁর উদ্দেশ্য কী?
গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি 'The Consumption of Reality' বা বাস্তবতার গ্রাসকে নির্দেশ করে। জগত যা কিছু প্রসব করে, তাকে আবার নিজেই খেয়ে ফেলে। একেই বলা হয় 'ক্রোনোফ্যাগি' (Cronophagy) বা সময় কর্তৃক জগতকে ভক্ষণ। 'লেলিহ্যসে' শব্দটি নির্দেশ করে যে ধ্বংস ঈশ্বরের কাছে কোনো শোকের বিষয় নয়, এটি তাঁর আনন্দের লীলা। যেমন একটি শিশু বালি দিয়ে ঘর বানিয়ে আবার তা ভেঙে আনন্দ পায়, ঈশ্বরও তেমনি জগত সৃষ্টি করে আবার তা নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে আনন্দ পান। দার্শনিক বিচারে, প্রলয় হলো মহাবিশ্বের এক ধরণের 'Rest' বা বিশ্রাম।
তত্ত্বগতভাবে, এটি হলো 'Universal Metabolism'। মহাবিশ্বে প্রতিটি ছায়াপথ, প্রতিটি নক্ষত্র ক্রমাগত শক্তি উৎপন্ন করছে এবং এক সময় ব্ল্যাক হোলের গ্রাসে চলে যাচ্ছে। কৃষ্ণ এখানে সেই পরম 'Cosmic Black Hole' যার থেকে আলোও বেরোতে পারে না। আপনি যখন একটি 'Garbage Collector' বা 'Data Purge' অপারেশন চালান যা সিস্টেমের সব পুরনো ক্যাশ (Cache) এবং টেম্পোরারি ফাইল ক্লিন করে দেয়, কৃষ্ণ এখানে সেই ক্লিনআপ অপারেশন করছেন। 'ভাসস্তবোগ্রাঃ' মানে হলো উচ্চ এনার্জি রেডিয়েশন যা পুরো স্পেসকে ইনফ্লুয়েন্স করছে।
ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে মৃত্যুও ভগবানেরই একটি রূপ। আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই, কিন্তু তা ভগবানেরই একটি কাজ। অর্জুনের এই দর্শনটি আমাদের জীবনের প্রতি আসক্তি (Attachment) কমিয়ে দেয়। আমরা যখন দেখি যে সব কিছুই কৃষ্ণের লেলিহান জিহ্বার খাদ্য, তখন আমরা আর কোনো কিছুর জন্য হাহাকার করি না। এই শ্লোকটি আমাদের 'বৈরাগ্য' এবং 'বিবেকের' শিক্ষা দেয়। অর্জুন এখন বুঝতে পারছেন যে তাঁর লড়াই কোনো জমি বা রাজত্বের জন্য নয়, এটি হলো এক মহাজাগতিক যজ্ঞের অংশ যেখানে তাঁকে কেবল তাঁর কাজটুকু করে যেতে হবে। এই ভয়াবহতা দেখার পরই অর্জুন তাঁর পরবর্তী প্রশ্নে ফিরে যাবেন—আপনি কে? (আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো)। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের সব মিথ্যা অহংকারকে পুড়িয়ে দিয়ে এক নগ্ন ও পরম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।