জ্ঞেয়ং যত্তৎ প্রবক্ষ্যামি যজজ্ঞাত্বামৃতমশ্নুতে ।
অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সত্তন্নাসদুচ্যতে ॥ ১৩.১৩ ॥
সরল ভাবার্থ:
এখন আমি সেই 'জ্ঞেয়' বা জানার যোগ্য পরম সত্য সম্পর্কে বলব, যা জানলে মানুষ অমৃত বা মোক্ষ লাভ করে। সেই পরম ব্রহ্ম অনাদি, তাঁকে সৎ (অস্তিত্বশীল) বা অসৎ (অস্তিত্বহীন)—কোনোটিই বলা যায় না।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
শ্রীকৃষ্ণ এখন অর্জুনের প্রশ্নের সেই অংশে প্রবেশ করছেন যেখানে তিনি 'জ্ঞেয়' বা পরম সত্যের কথা বলবেন। আগের শ্লোকগুলোতে আমরা 'জ্ঞান' অর্জনের পদ্ধতি জেনেছি, এখন জানব সেই জ্ঞানের লক্ষ্য কী। কৃষ্ণ বলছেন, এই জ্ঞানটি সাধারণ কোনো তথ্য নয়; এটি জানলে মানুষ 'অমৃত' বা অমরত্ব লাভ করে। অমরত্ব মানে এই শরীরের বেঁচে থাকা নয়, বরং জন্ম-মৃত্যুর অন্তহীন চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া। এই জ্ঞেয় বস্তু হলো 'পরং ব্রহ্ম'। তিনি অনাদি, অর্থাৎ তাঁর কোনো শুরু নেই। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কৃষ্ণ এখানে এক বিস্ময়কর কথা বলছেন—ব্রহ্মকে 'সৎ' (যা আছে) বা 'অসৎ' (যা নেই) কোনোটিই বলা যায় না। কেন?
বিস্তারিতভাবে দেখলে, আমাদের ভাষা এবং বুদ্ধি খুব সীমাবদ্ধ। আমরা কোনো কিছুকে হয় 'আছে' বলি নতুবা 'নেই' বলি। কিন্তু ব্রহ্ম এই দুইয়েরই অতীত। তিনি এত সূক্ষ্ম যে তাঁকে ইন্দ্রিয় দিয়ে 'আছে' বলে ধরা যায় না, আবার তিনি সবকিছুর ভিত্তি বলে তাঁকে 'নেই' বলাও অসম্ভব। তিনি আকাশের মতো—যাকে আমরা শূন্য বলি কিন্তু যা ছাড়া কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়। কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই চরম সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন যা মানুষের তর্কের অতীত। আমরা যখন কোনো গাছ দেখি, আমরা বলি সেটি 'সৎ' (বিদ্যমান)। কিন্তু সেই গাছটি তো সময়ের সাথে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ব্রহ্ম কখনও ধ্বংস হন না, আবার তিনি কোনো বস্তুর মতো দৃশ্যমানও নন। অর্জুনের মনে যে যুদ্ধের বিভীষিকা ছিল, তাকে দূর করতে এই 'অমৃতময়' জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি ছিল। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে সে এক অনন্ত, অনাদি সত্তার অংশ, তখন সে মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পায়।
এই বিশ্লেষণের আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে আমাদের বুদ্ধির অহংকার চূর্ণ করছেন। আমরা মনে করি সবকিছু লজিক দিয়ে বুঝে ফেলব। কিন্তু পরম সত্য লজিকের সীমানার বাইরে। ন সত্তন্নাসদুচ্যতে—এই শব্দবন্ধটি উপনিষদের ঋষিদের দীর্ঘ গবেষণার ফল। এটি আমাদের শেখায় যে ঈশ্বরকে কোনো সংজ্ঞার খাঁচায় বন্দি করা যায় না। তিনি অব্যক্ত হয়েও সব ব্যক্ত বস্তুর প্রাণ। অর্জুন যখন তাঁর আত্মীয়দের হারিয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলেন, তখন কৃষ্ণ তাঁকে শেখালেন যে আত্মা বা ব্রহ্ম কখনও হারিয়ে যায় না, কারণ তাঁর বিনাশ নেই। শ্রীকৃষ্ণের এই রহস্যময় বর্ণনা আমাদের মনকে জাগতিক সীমা থেকে এক মহাজাগতিক অসীমে নিয়ে যায়। এটিই হলো প্রকৃত প্রজ্ঞার শুরু, যেখানে মানুষ বুঝতে পারে যে দৃশ্যমান জগতের পেছনে এক অসীম অদৃশ্য সত্তা কাজ করছে। এই জ্ঞানই হলো পরম শান্তি এবং মুক্তির চাবিকাঠি।
গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :
দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'Apophatic Theology' বা 'নেতি নেতি' (Not this, Not that) দর্শনের সারকথা। ব্রহ্মকে কোনো নির্দিষ্ট গুণের দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না বলে তাঁকে সৎ বা অসৎ বলা যায় না। দার্শনিক বিচারে 'সৎ' হলো সেই জগত যা আমরা অনুভব করি (Manifest), আর 'অসৎ' হলো সেই কারণ যা আমরা দেখতে পাই না (Unmanifest)। ব্রহ্ম এই দুটিরই ঊর্ধ্বে বা আধার। তিনি হলেন 'The Ultimate Reality'।
উদাহরণস্বরূপ, একটি মাটির কলসের কথা ভাবুন। কলসটি তৈরির আগে মাটি ছিল, কলস ভাঙার পরও মাটি থাকে। কিন্তু কলসটি যখন থাকে, তখনও মাটিই থাকে। এখানে মাটি হলো ব্রহ্ম। কলসটি 'সৎ' (দৃশ্যমান), কিন্তু তা পরিবর্তনশীল। মাটি নিজে কোনো নির্দিষ্ট রূপ নয়, কিন্তু সব রূপের উৎস। দার্শনিক বিচারে ব্রহ্মকে বলা হয় 'Transcendental' অর্থাৎ যা সবকিছুর অতীত। পাশ্চাত্য দর্শনে কান্ট যেমন 'Thing-in-itself' এর কথা বলেছিলেন যা মানুষ কখনও জানতে পারে না, কৃষ্ণ বলছেন—না, শুদ্ধ জ্ঞান বা ভক্তির মাধ্যমে তাঁকে জানা সম্ভব এবং তাঁকে জানাই হলো জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি আমাদের 'Logic of Contradiction' শেখায়। জগতের সবকিছুই হয় 'A' অথবা 'Not A'। কিন্তু ব্রহ্ম 'A' এবং 'Not A' উভয়ই এবং কোনোটিই নন। এটিই হলো অদ্বৈত দর্শনের মাহাত্ম্য। অর্জুনের জন্য এই দার্শনিক জ্ঞানটি ছিল এক মহা-জাগরণ। তিনি বুঝতে পারলেন যে যে সত্যের জন্য তিনি লড়াই করছেন, তা কোনো জাগতিক রাজ্য নয়, বরং তা হলো সেই অবিনাশী ব্রহ্ম। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে সত্যকে পাওয়ার জন্য আমাদের লজিক ও বুদ্ধির সীমানা পার হয়ে অনুভবের স্তরে পৌঁছাতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের আলোতে উদ্ভাসিত হওয়ার পরম পথ দেখায়। এটিই হলো জীবনের অমৃত আস্বাদন।