॥ অধ্যায় ১৩, শ্লোক ১৭ ॥

অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্ ।
ভূতভর্তৃ চ তজ্জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ ॥ ১৩.১৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

সেই ব্রহ্ম সমস্ত প্রাণীর মধ্যে অবিভক্ত হয়েও যেন বিভক্তের মতো অবস্থান করছেন। তাঁকে সমস্ত প্রাণীর পালনকর্তা (ভূতভর্তৃ), সংহারকর্তা (গ্রসিষ্ণু) এবং সৃষ্টিকর্তা (প্রভবিষ্ণু) হিসেবে জানতে হবে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

এই শ্লোকটি পরমাত্মার সেই একত্বের রহস্য ফাঁস করে দিচ্ছে যা আমরা সচরাচর ভুলে যাই। কৃষ্ণ বলছেন, ব্রহ্ম হলেন 'অবিভক্তং'—অর্থাৎ তিনি এক এবং অখণ্ড। কিন্তু যখন তিনি কোটি কোটি প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করেন, তখন মনে হয় তিনি 'বিভক্ত' বা আলাদা হয়ে গেছেন। এটি এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। যেমন আকাশে একটিই চাঁদ থাকে, কিন্তু যদি নিচে এক হাজার জলের পাত্র থাকে, তবে মনে হবে এক হাজারটি চাঁদ আছে। আসলে চাঁদ তো একটিই, তার প্রতিবিম্বগুলো আলাদা। ঠিক তেমনি, প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকা আত্মা আসলে সেই এক পরমাত্মারই রূপ। আমরা বাইরে থেকে মানুষকে হিন্দু-মুসলিম, সাদা-কালো বা শত্রু-মিত্র হিসেবে আলাদা করি, কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন তাঁদের ভেতরের উৎসটি এক এবং অবিভক্ত।

এরপর কৃষ্ণ তাঁর তিনটি প্রধান মহাজাগতিক কাজের কথা বলছেন। তিনি 'প্রভবিষ্ণু' বা সৃষ্টিকর্তা—সবকিছু তাঁর থেকেই উৎপন্ন হয়। তিনি 'ভূতভর্তৃ' বা পালনকর্তা—সবকিছু তাঁর শক্তিতেই বেঁচে থাকে। এবং তিনি 'গ্রসিষ্ণু' বা সংহারকর্তা—সবকিছু শেষে তাঁর ভেতরেই লীন হয়ে যায়। কৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে এই কুরুক্ষেত্রের ময়দানে যে বিনাশ তুমি দেখছ, তা আসলে পরমাত্মারই 'গ্রসিষ্ণু' রূপ। সৃষ্টি এবং লয় তাঁরই খেলার অংশ। তাই তুমি মিছে শোক কোরো না। এই বিশাল প্রেক্ষাপটে দেখলে মৃত্যু কোনো শেষ নয়, বরং পরমাত্মার কাছে ফিরে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। অর্জুনকে এই 'জ্ঞেয়' বস্তুর কথা বলা হচ্ছে যাতে তিনি ব্যক্তিগত রাগ-অনুরাগ থেকে বেরিয়ে এক বৈশ্বিক সত্যের মুখোমুখি হতে পারেন।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে আমাদের 'ভেদাভেদ' বুদ্ধি দূর করতে চাইছেন। আমরা যখন বুঝতে পারি যে প্রতিটি মানুষের ভেতরে সেই একই অখণ্ড সত্তা বিরাজমান, তখন আমাদের হিংসা ও অহংকার চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমরা তখন জগতকে একটি অখণ্ড পরিবার হিসেবে দেখতে শুরু করি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী করে তোলে। তিনি দেখান যে ঈশ্বর কোনো দূরে বসে থাকা বিচারক নন, তিনি আমাদের প্রতিটি কোষের ধারক ও বাহক। এই জ্ঞান অর্জন করলে মানুষ জীবনের প্রতিটি সাফল্যে বা ব্যর্থতায় ধীরস্থির থাকে। কারণ সে জানে সবকিছুই সেই এক পরমাত্মার ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অংশ। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের জড় জগতের ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করে এক মহাজাগতিক চৈতন্যের মহাসমুদ্রে নিয়ে যায়। এটিই হলো মোক্ষ লাভের প্রকৃত চাবিকাঠি।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'The One and the Many' (এক ও বহু) সমস্যার সমাধান দেয়। শংকরাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত অনুযায়ী, ব্রহ্ম এক, কিন্তু মায়ার কারণে তাঁকে বহু মনে হয়। একে বলা হয় 'বিবর্তবাদ'। দার্শনিক বিচারে ব্রহ্ম হলেন জগত-প্রপঞ্চের 'Material Cause' (উপাদান কারণ) এবং 'Efficient Cause' (নিমিত্ত কারণ) উভয়ই। তিনি মাকড়সার মতো জাল তৈরি করেন (প্রভবিষ্ণু), জালটি রক্ষা করেন (ভর্তৃ) এবং পরে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে নেন (গ্রসিষ্ণু)।

উদাহরণস্বরূপ, মাটির কথা ভাবুন। মাটি দিয়ে হাজার হাজার রকমের খেলনা বা পাত্র তৈরি হতে পারে। রূপগুলো আলাদা (বিভক্তমিব), কিন্তু মাটি তো সেই একই (অবিভক্তং)। খেলনাটি যখন তৈরি হয় তখন মাটিই থাকে, যখন খেলা হয় তখনও মাটি, আর যখন ভেঙে যায় তখনও মাটিতেই মিশে যায়। দার্শনিক বিচারে জগত হলো ব্রহ্মের এক সাময়িক রূপান্তর বা প্রক্ষেপ। পাশ্চাত্য দর্শনে প্লেটো (Plato) এর 'Theory of Forms' এর সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে, যদিও প্লেটোর দর্শন দ্বৈতবাদী আর কৃষ্ণের দর্শন চরম অদ্বৈতবাদী।

তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি আমাদের 'Holistic Vision' দান করে। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর, কারণ তিনি খণ্ড খণ্ড সম্পর্কের মায়ায় আটকে ছিলেন। কৃষ্ণ তাকে দেখালেন যে সকল জীবই সেই এক পরম পুরুষের অংশ। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান হলো বিভেদের মাঝে ঐক্য দেখা। যখন আমরা এই অবিভক্ত ব্রহ্মের ধারণা হৃদয়ে ধারণ করি, তখনই আমরা প্রকৃত অর্থে 'সমদর্শী' হতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের ক্ষুদ্র অহংকারকে ভেঙে সত্যের এক বিরাট সাগরে বিলীন করে দেয়। এটিই হলো জীবনের চরম উপলব্ধি।