॥ অধ্যায় ১৩, শ্লোক ২০ ॥

প্রকৃতিং পুরুষং চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি ।
বিকারাম্শ্চ গুণাম্শ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবাম্ ॥ ১৩.২০ ॥

সরল ভাবার্থ:

তুমি জেনে রেখো যে প্রকৃতি ও পুরুষ—উভয়ই অনাদি। সমস্ত বিকার (পরিবর্তন) এবং গুণসমূহ (সত্ত্ব, রজ, তম) প্রকৃতি থেকেই উৎপন্ন হয়েছে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

শ্রীকৃষ্ণ এখন অর্জুনের প্রশ্নের প্রথম দুটি বিষয়—'প্রকৃতি' এবং 'পুরুষ' নিয়ে আলোচনা শুরু করছেন। তিনি বলছেন, প্রকৃতি (জড় জগত) এবং পুরুষ (চৈতন্য বা আত্মা)—এদের দুজনেরই কোনো শুরু নেই, এরা দুজনেই অনাদি। এটি একটি অত্যন্ত গভীর বৈজ্ঞানিক সত্য। আমরা সাধারণত মনে করি কোনো এক সময় ঈশ্বর এই জগত সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, শক্তিরূপী প্রকৃতি এবং সচেতনরূপী পুরুষ সবসময়ই ছিল। সৃষ্টি মানে হলো এদের সংযোগের ফলে এক নতুন রূপের প্রকাশ। প্রকৃতি হলো সেই কাঁচামাল যা দিয়ে জগত তৈরি হয়, আর পুরুষ হলো সেই দর্শক বা ভোগকর্তা যার জন্য এই জগত তৈরি হয়।

কৃষ্ণ আরও বলছেন, বিকারাম্শ্চ গুণাম্শ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবাম্—অর্থাৎ শরীরের সব পরিবর্তন (জন্ম, বৃদ্ধি, মৃত্যু) এবং মনের সব গুণ (সুখ, দুঃখ, রাগ, ধৈর্য) প্রকৃতি থেকে আসে। আত্মা বা পুরুষ নিজে কিছুই করে না, সে কেবল প্রকৃতির এই পরিবর্তনগুলো দেখে। আমাদের রাগ হচ্ছে বা আমরা বুড়ো হচ্ছি—এটি প্রকৃতির খেলা। যখন আমরা এই সত্যটি বুঝতে পারি, তখন আমরা আমাদের সমস্যার জন্য নিজেদের দোষারোপ করা বন্ধ করি। আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের মন বা শরীর প্রকৃতির নিয়মেই চলছে, কিন্তু আমাদের ভেতরের আত্মা স্থির। অর্জুনকে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে যুদ্ধের ময়দানে যে রক্তপাত বা জয়-পরাজয় হবে, তা প্রকৃতির বিকার মাত্র। আত্মা এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই জ্ঞান মানুষকে এক অসামান্য ডিটাচমেন্ট বা আসক্তিহীনতা প্রদান করে।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে দ্বৈতবাদের এক চমৎকার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। প্রকৃতি হলো মায়া বা শক্তির রূপ, আর পুরুষ হলো সেই অসীম স্থিরতা। আমরা যখন নিজেদের কেবল এই শরীরের বা মনের অংশ মনে করি, তখন আমরা প্রকৃতির দাসে পরিণত হই। কিন্তু যখন আমরা জানি যে আমরা অনাদি 'পুরুষ' বা আত্মা, তখন আমরা স্বাধীন হই। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের শেখায় যে জীবনের ঝড়-ঝাপটা কেবল ওপরের স্তরে (প্রকৃতিতে) ঘটে, কিন্তু আমাদের গভীরে সবসময় এক অনাদি শান্তি বিরাজমান। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের প্রতিটি সংকটে এক নতুন শক্তি দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা আমাদের পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বড়। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে এক সার্বভৌম চৈতন্যের দিকে নিয়ে যায়। এটিই হলো প্রকৃতি ও পুরুষের প্রকৃত রহস্য যা জানলে মানুষ পরম শান্তি লাভ করে।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি সাংখ্য দর্শনের মূল ভিত্তি। সাংখ্য মতে পুরুষ ও প্রকৃতি হলো দুটি স্বতন্ত্র সত্তা। প্রকৃতি হলো 'অচেতন কিন্তু সক্রিয়' (Unconscious but Active) এবং পুরুষ হলো 'সচেতন কিন্তু নিষ্ক্রিয়' (Conscious but Passive)। কৃষ্ণ এখানে অনাদি শব্দের মাধ্যমে এদের নিত্যতাকে স্বীকার করেছেন। দার্শনিক বিচারে 'বিকার' মানে হলো 'Transformation of Energy'। যেমন মাটি থেকে কলস হওয়া প্রকৃতির বিকার, কিন্তু মাটির অস্তিত্ব তাতেও থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, একটি নাচের অনুষ্ঠানের কথা ভাবুন। নর্তকী স্টেজে নাচছে—সেটি হলো প্রকৃতি এবং তার বিকার (নাচের মুদ্রা)। আর দর্শক গ্যালারিতে বসে নাচটি দেখছেন—তিনি হলেন পুরুষ। দর্শক নিজে নাচছেন না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি ছাড়া নাচের কোনো সার্থকতা নেই। দার্শনিক বিচারে গুণত্রয় (সত্ত্ব, রজ, তম) হলো প্রকৃতির বুনন। আত্মা এই গুণের জালে ধরা পড়ে মনে করে সে-ই কর্তা। এটিই হলো অজ্ঞানতা। পাশ্চাত্য দর্শনে ডেসকার্টস (Descartes) এর 'Dualism' (Mind and Matter) এর সাথে এর মিল থাকলেও কৃষ্ণের এই দর্শন অনেক বেশি গভীর কারণ এখানে প্রকৃতিকেও অনাদি বলা হয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি আমাদের 'Causality' বা কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝায়। জগতের সব পরিবর্তন প্রকৃতির কারণে হয়, পুরুষ কেবল সাক্ষী। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল এক মহা-উদ্ধার। তিনি বুঝতে পারলেন যে যুদ্ধের বিনাশ প্রকৃতি দ্বারা নির্ধারিত, তিনি কেবল এক মাধ্যম। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে জীবনের সাফল্যে বা ব্যর্থতায় আমাদের অহংকারী হওয়া বা ভেঙে পড়া উচিত নয়, কারণ সবকিছুই প্রকৃতির গুণের খেলা। যখন আমরা এই অনাদি প্রকৃতি ও পুরুষের পার্থক্য হৃদয়ে ধারণ করি, তখনই আমরা প্রকৃত প্রজ্ঞার স্তরে পৌঁছাই। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো জীবনের চরম মুক্তি।