॥ অধ্যায় ১৩, শ্লোক ২৮ ॥

সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্ ।
বিনশ্যন্তস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি ॥ ১৩.২৮ ॥

সরল ভাবার্থ:

যিনি সমস্ত বিনাশশীল প্রাণীর মধ্যে সেই অবিনাশী পরমেশ্বরকে সমানভাবে বিরাজমান দেখেন, তিনিই প্রকৃতপক্ষে সত্য দর্শন করেন।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

এই শ্লোকটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি কালজয়ী ঘোষণা। শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'প্রকৃত দেখা' বা দর্শনের সংজ্ঞা দিচ্ছেন। আমরা আমাদের চোখ দিয়ে যা দেখি, কৃষ্ণ তাকে দেখা বলছেন না। আমরা দেখি মানুষের শরীর, তার বয়স, তার বর্ণ বা তার শত্রুতা-মিত্রতা। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, এই যে শরীরগুলো এগুলো সব 'বিনশ্যন্ত' বা বিনাশশীল। আজ আছে কাল নেই। কিন্তু এই বিনাশশীল শরীরের ভেতরে একজন 'অবিনাশী' পরমেশ্বর আছেন যিনি সবার মধ্যে সমানভাবে অবস্থান করছেন। যিনি এই সত্যটি দেখতে পান, তিনিই হলেন প্রকৃত জ্ঞানী। যঃ পশ্যতি স পশ্যতি—অর্থাৎ তিনিই আসল দেখা দেখেন, বাকি সবাই অন্ধ।

বিস্তারিতভাবে দেখলে, কৃষ্ণ এখানে এক বিশাল সাম্যের কথা বলছেন। একজন রাজা এবং একজন ভিখারি, একজন পণ্ডিত এবং একজন মূর্খ—বাইরে থেকে তাঁদের অনেক পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাঁদের ভেতরের পরমেশ্বর এক এবং সমান। এই দৃষ্টিটিই হলো 'সমদর্শিতা'। অর্জুনকে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, যুদ্ধের ময়দানে তোমার সামনে ভীষ্ম বা দ্রোণাচার্য দাঁড়িয়ে আছেন—তাঁদের শরীর বিনাশশীল হতে পারে, কিন্তু তাঁদের ভেতরের পরমেশ্বর অবিনাশী এবং তিনি তোমার ভেতরেও আছেন। এই জ্ঞান থাকলে মানুষের মধ্যে আর ঘৃণা থাকে না। কারণ আমরা তখন বুঝতে পারি যে অন্যকে ঘৃণা করা মানে নিজের ভেতরের ঈশ্বরকেই অপমান করা। এটিই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিক বিপ্লব যা প্রতিটি মানুষকে এক গভীর সম্মানের চোখে দেখতে শেখায়।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে আমাদের 'X-ray Vision' দিতে চাইছেন। এক্স-রে যেমন মাংসপেশি ভেদ করে হাড় দেখতে পায়, তেমনি জ্ঞান দিয়ে আমাদের শরীরের আবরণ ভেদ করে ভেতরের আত্মাকে দেখতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের শেখায় যে বাহ্যিক পার্থক্যগুলো মায়া মাত্র। আমরা যখন এই জগতকে এক অখণ্ড পরমেশ্বরের প্রকাশ হিসেবে দেখি, তখন আমাদের সব ভয় ও শোক দূর হয়ে যায়। অর্জুনের জন্য এটি ছিল এক মহা-ঔষধ। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর আত্মীয়দের মৃত্যু কেবল বাহ্যিক শরীরের বিনাশ, কিন্তু ভেতরের সত্যটি চিরকাল অক্ষত থাকে। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটিই হলো জীবনের প্রকৃত দর্শন যা আমাদের প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'Advaita' বা অদ্বৈতবাদের চরম শিখর। এখানে 'সমং' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরমেশ্বর সবার মধ্যে কম বা বেশি নন, তিনি পূর্ণভাবে এবং সমানভাবে আছেন। দার্শনিক বিচারে একে বলা হয় 'Unitary Consciousness'। জগত হলো বহুত্বের প্রপঞ্চ (Phenomena), কিন্তু তার ভিত্তি হলো একত্বের সত্য (Noumena)। যিনি এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি দেখেন, তিনিই হলেন 'তত্ত্বদর্শী'।

উদাহরণস্বরূপ, মাটির বিভিন্ন পাত্রের কথা ভাবুন। পাত্রগুলো ছোট, বড়, সুন্দর বা কদর্য হতে পারে। যখন তারা ভেঙে যায়, তখন তাদের আকার বিলুপ্ত হয় (বিনশ্যন্ত)। কিন্তু যে মাটি দিয়ে তারা তৈরি হয়েছিল, সেই মাটি সবসময় অবিনাশী থাকে (অবিনশ্যন্ত)। মাটিটি প্রতিটি পাত্রের মধ্যে সমানভাবে উপস্থিত। দার্শনিক বিচারে জগত হলো পরিবর্তন বা 'Becoming', আর পরমেশ্বর হলেন অস্তিত্ব বা 'Being'। পাশ্চাত্য দর্শনে পারমেনাইডস (Parmenides) এবং হেরাক্লিটাস (Heraclitus) এর দ্বন্দ্বের সমাধান কৃষ্ণের এই শ্লোকে পাওয়া যায়।

তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে মৃত্যু কোনো অভাব নয়, এটি কেবল রূপের পরিবর্তন। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত জরুরি, কারণ তিনি যুদ্ধের কারণে শোকগ্রস্ত ছিলেন। কৃষ্ণ তাকে দেখালেন যে পরমেশ্বর কখনও মরেন না। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি কেবল এই অবিনাশী সত্যকে আঁকড়ে ধরার মধ্যে নিহিত। যখন আমরা বিভেদের মাঝে ঐক্য দেখতে শিখি, তখনই আমরা মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো মুক্তির প্রকৃত বিজ্ঞান।