॥ অধ্যায় ১৩, শ্লোক ৭ ॥

ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সঙ্ঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ ।
এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্ ॥ ১৩.৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, দেহের কাঠামো (সংঘাত), প্রাণশক্তি (চেতনা) ও ধৈর্য—এই সবগুলিকে একত্রে বিকারযুক্ত 'ক্ষেত্র' বলা হয়।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

আগের শ্লোকে কৃষ্ণ শরীরের স্থূল ও সূক্ষ্ম উপাদানের কথা বলেছিলেন। এই শ্লোকে তিনি আমাদের মানসিক অবস্থা এবং শরীরের ক্রিয়াশীলতাকে 'ক্ষেত্র' বা জড় জগতের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ইচ্ছা (Desire) এবং দ্বেষ (Aversion)—এই দুটি হলো আমাদের জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি। আমরা যা পেতে চাই তা ইচ্ছা, আর যা থেকে দূরে থাকতে চাই তা দ্বেষ। সুখ ও দুঃখ হলো এই প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির ফলাফল। কৃষ্ণ বলছেন, এই চারটি মানসিক অনুভূতিও আসলে জড় প্রকৃতির বিকার। এটি একটি অত্যন্ত গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য। সাধারণত আমরা মনে করি আমি সুখী বা আমি দুঃখী। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, সুখ বা দুঃখ আপনার আত্মার ধর্ম নয়, এটি আপনার মনের বা ক্ষেত্রের একটি অবস্থা মাত্র। যেমন আবহাওয়া কখনও রৌদ্রোজ্জ্বল হয় আবার কখনও মেঘলা, তেমনি সুখ-দুঃখও আপনার চেতনার আকাশে আসা-যাওয়া করে।

এরপর কৃষ্ণ 'সঙ্ঘাত', 'চেতনা' এবং 'ধৃতি'-র কথা বলেছেন। সঙ্ঘাত মানে হলো আমাদের এই হাড়-মাংস-রক্তের সংমিশ্রণ বা শারীরিক কাঠামো যা চব্বিশটি উপাদানকে ধরে রাখে। চেতনা এখানে 'শুদ্ধ আত্মা' নয়, বরং শরীরের ভেতরের সেই প্রাণশক্তি বা 'Reflected Consciousness' যা আমাদের শরীরকে সজীব রাখে। যখন কেউ মারা যায়, তখন এই চেতনাটি চলে যায়। আর ধৃতি হলো ধৈর্য বা সহ্য করার শক্তি যা আমাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়তে দেয় না। কৃষ্ণ বলছেন, এই সবকটি বিষয় মিলেই হলো 'ক্ষেত্র'। সবিকারমুদাহৃতম্—অর্থাৎ এই ক্ষেত্রটি সবসময় বিকারগ্রস্ত বা পরিবর্তনশীল। এর কোনো অংশই চিরস্থায়ী নয়। আপনার ইচ্ছা আজ একরকম, কাল অন্যরকম। আপনার শরীর আজ সুস্থ, কাল অসুস্থ। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, তোমার মনের এই বিষাদ বা ভয়ও আসলে ক্ষেত্রের একটি বিকার। তুমি এর থেকে নিজেকে আলাদা করো।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ আমাদের এক অভাবনীয় মানসিক স্বাধীনতা দিচ্ছেন। আমরা যখন আমাদের আবেগগুলোকে (ইচ্ছা, ঘৃণা, সুখ, দুঃখ) নিজের থেকে আলাদা করতে পারি, তখন আমরা আর তাদের দাস থাকি না। আমরা তখন একজন নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষক হয়ে উঠি। অর্জুন যখন যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে মায়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছিলেন, তখন কৃষ্ণ তাঁকে এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিলেন যাতে অর্জুন বুঝতে পারেন যে তাঁর মায়া আসলে তাঁর মনের একটি সাময়িক বিকার মাত্র। এটিই হলো প্রকৃত আত্মজ্ঞান। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের মনের মেঘগুলো সরে গেলেও আমাদের ভেতরের আত্মা বা ক্ষেত্রজ্ঞ সবসময় সূর্যের মতো উজ্জ্বল থাকে। শ্রীকৃষ্ণের এই বিশ্লেষণ আমাদের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা শেখায়। আমরা যখন বুঝতে পারি যে আমাদের কষ্টগুলো কেবল আমাদের শরীরের বা মনের সফটওয়্যারের অংশ, তখন আমরা সেগুলোকে শান্তভাবে মোকাবিলা করতে পারি। এই শ্লোকটি আমাদের জীবনের প্রতিটি দ্বন্দ্বে এক অটল স্থিরতা দান করে। এটিই হলো ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগের প্রকৃত রহস্য যা মানুষকে পশুত্ব থেকে দেবত্বের দিকে নিয়ে যায়।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক বিচারে এই শ্লোকটি 'The Phenomenology of Experience' বা অভিজ্ঞতার প্রপঞ্চবিজ্ঞান। এখানে কৃষ্ণ ইচ্ছা, সুখ এবং দুঃখকে 'Objectified' করেছেন। পাশ্চাত্য দর্শনে যেমন 'Subjective-Objective' ভাগ আছে, কৃষ্ণ এখানে দেখিয়েছেন যে আমরা যাকে 'Subjective' মনে করি (আমাদের অনুভূতি), তাও আসলে 'Objective' বা ক্ষেত্রের অংশ। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দার্শনিক ধারণা। এর মানে হলো, আপনি আপনার দুঃখের দ্রষ্টা হতে পারেন। যদি আপনি আপনার দুঃখের দ্রষ্টা হতে পারেন, তবে আপনি নিজে দুঃখ নন। দার্শনিক বিচারে 'ধৃতি' বা ধৈর্য হলো সেই স্তম্ভ যা ক্ষেত্রকে স্থায়িত্ব দেয়।

উদাহরণস্বরূপ, একটি সিনেমার পর্দার কথা ভাবুন। পর্দায় কখনও আগুনের দৃশ্য (রাগ/দ্বেষ) দেখানো হয়, কখনও বৃষ্টির দৃশ্য (সুখ/দুঃখ) দেখানো হয়। পর্দাটি নিজে আগুনের পুড়ছে না বা বৃষ্টির জলে ভিজছে না। পর্দাটি স্থির। এই পর্দাটিই হলো ক্ষেত্রজ্ঞের ভিত্তি, আর ছবির দৃশ্যগুলো হলো ক্ষেত্রের বিকার। কৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে সেই স্থির পর্দাটি খুঁজে পেতে বলছেন। তাত্ত্বিকভাবে, 'চেতনা' এখানে মনস্তাত্ত্বিক সচেতনতা বা 'Biological Awareness' যা জড় প্রকৃতির সাথে পুরুষ বা আত্মার সংযোগের ফলে উৎপন্ন হয়। এটি সেই 'Intellect' বা বুদ্ধির এক রূপ যা শরীরের ইন্দ্রিয়গুলোকে চালনা করে।

পাশ্চাত্য মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েড বা কার্ল ইয়ুং মানুষের মনের গহীনে যে জটিলতার কথা বলেছিলেন, কৃষ্ণ এখানে তাকে একটি সুশৃঙ্খল ছকে বেঁধে দিয়েছেন। তিনি বলছেন যে জগতের সব কিছুই এই কয়েকটি তত্ত্বের খেলা। অর্জুনের জন্য এই দার্শনিক জ্ঞানটি ছিল এক বড় আশ্রয়। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর যুদ্ধের ভয় বা আত্মীয় হারানোর শোক আসলে প্রকৃতির গুণের ঘাত-প্রতিঘাত মাত্র। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত মুক্তি হলো এই বিকারগুলো থেকে নিজেকে বিযুক্ত করা। যখন আমরা আমাদের ভেতরের এই শান্ত ও অপরিবর্তনীয় সত্তাকে খুঁজে পাই, তখনই আমরা জীবনের সব ঝড় মোকাবিলা করতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে এক সার্বভৌম চৈতন্যের দিকে নিয়ে যায়। এটিই হলো মোক্ষ লাভের প্রকৃত চাবিকাঠি যা আমাদের প্রতিটি অনুভূতিকে সঠিক দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়।