অপ্রকাশোঽপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরু নন্দন ॥ ১৪.১৩ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে কুরুনন্দন! তম গুণ বৃদ্ধি পেলে অন্ধকার (অবিবেক), নিষ্ক্রিয়তা, প্রমাদ (ভুল কাজ) এবং মোহ উৎপন্ন হয়।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
সবশেষে কৃষ্ণ তম গুণের ভয়াবহ লক্ষণগুলো তুলে ধরছেন। তিনি বলছেন, তম গুণ যখন জয়ী হয়, তখন মানুষের মধ্যে অপ্রকাশঃ বা অন্ধকার নেমে আসে। এটি চোখের অন্ধকার নয়, এটি হলো বুদ্ধির অন্ধকার। মানুষ তখন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা বুঝতে পারে না। তার মধ্যে অপ্রবৃত্তি বা চরম অলসতা দেখা দেয়। সে কোনো কাজ করতেই চায় না। এরপর আসে প্রমাদ বা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সে কাজ করলেও তা ভুলভাবে করে বা অবহেলার সাথে করে। সবশেষে আসে মোহ বা বিভ্রম। সে তখন মিথ্যাকে সত্য মনে করে এবং ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়।
বিস্তারিতভাবে দেখলে, তম গুণ হলো মানুষের অধঃপতনের সবথেকে বড় কারণ। এটি মানুষকে জড়তায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। তমোগুণী ব্যক্তি সবসময় নেতিবাচকতায় ডুবে থাকে, সে সারাক্ষণ ভাগ্যের দোহাই দেয় কিন্তু নিজে কোনো চেষ্টা করে না। কৃষ্ণ অর্জুনকে কুরু নন্দন বলে সম্বোধন করে তাঁকে তাঁর বংশের গৌরবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যাতে অর্জুন এই তমসিকতা বা বিষাদ থেকে বেরিয়ে আসেন। যুদ্ধের ময়দানে অর্জুনের যে হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া বা গাণ্ডীব ধনু পড়ে যাওয়া—এগুলো তমেরই একটি সূক্ষ্ম প্রভাব ছিল। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আমাদের জীবনের অন্ধকার দূর করতে গেলে সচেতনভাবে তমের জড়তাকে ভাঙতে হবে। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের সতর্ক করে দেয় যাতে আমরা কখনও আলস্য বা মোহের কাছে আত্মসমর্পণ না করি।
এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে তম গুণকে একটি 'Psychological Fog' বা মানসিক কুয়াশার সাথে তুলনা করছেন। কুয়াশায় যেমন পথ দেখা যায় না, তমের প্রভাবেও জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটিই হলো সেই গভীর অন্ধকার যা থেকে মুক্তি পেতে গেলে প্রজ্ঞার প্রদীপ জ্বালাতে হয়। এই শ্লোকটি আমাদের প্রতিটি দিনকে তমসিকতা মুক্ত করে রাজসিক ও সাত্ত্বিক কর্মের দিকে এগোতে অনুপ্রাণিত করে। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের অন্তরের পশুত্বকে দূর করে মনুষ্যত্ব ও দেবত্বের পথে নিয়ে যায়।
গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :
দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'The Anatomy of Ignorance' বা অজ্ঞতার শারীরস্থান। এখানে 'অপ্রকাশ' শব্দটি ব্রহ্মজ্ঞানের অভাবকে সূচিত করে। দার্শনিক বিচারে তম গুণ হলো 'Avidya' বা অবিদ্যার ঘনীভূত রূপ। এটি সত্ত্ব গুণের 'Illumination' এবং রজ গুণের 'Activity'—উভয়কেই গ্রাস করে ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ, একটি মূর্তির কথা ভাবুন যা পাথরে ঢাকা আছে। পাথরটি হলো তম গুণ, যা মূর্তির সৌন্দর্যকে প্রকাশ হতে দিচ্ছে না। তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে তম গুণ হলো আধ্যাত্মিক বিবর্তনের সর্বনিম্ন স্তর। পাশ্চাত্য দর্শনে যেমন 'Nihilism' বা শূন্যতাবাদের কথা বলা হয়েছে যেখানে জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না, কৃষ্ণের এই বর্ণনা তমের প্রভাবে সৃষ্ট সেই অর্থহীনতাকেই ব্যাখ্যা করে।
তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে তম গুণ মানুষকে পশুর সমতুল্য করে তোলে কারণ পশুরও কোনো বিবেক বা বিচারবুদ্ধি নেই। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল এক সাবধানবাণী। তিনি বুঝতে পারলেন যে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া বীরত্ব নয় বরং তমের কাছে আত্মসমর্পণ। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি কেবল এই মোহ ও জড়তা থেকে মুক্তির মধ্যে নিহিত। যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের আলস্য আসলে আমাদের আত্মার অবমাননা, তখনই আমরা জেগে উঠি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো অন্ধকারের স্বরূপ।