তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহিনাম্ ।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত ॥ ১৪.৮ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে ভারত! আর তম গুণকে অজ্ঞানতা থেকে উৎপন্ন এবং সমস্ত জীবের মোহ সৃষ্টিকারী বলে জানো। এই গুণটি মানুষকে প্রমাদ (ভুল বা অসতর্কতা), আলস্য এবং নিদ্রার দ্বারা আবদ্ধ করে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
সত্ত্ব ও রজের পর সবশেষে আসছে 'তম গুণ'। এটি হলো অন্ধকারের গুণ। কৃষ্ণ বলছেন, তম গুণ সরাসরি অজ্ঞানতা বা অন্ধকার থেকে আসে। এটি আমাদের বুদ্ধিকে এমনভাবে ঢেকে দেয় যে আমরা ভালো ও মন্দের পার্থক্য ভুলে যাই। তম গুণের প্রধান অস্ত্র হলো তিনটি—প্রমাদ, আলস্য এবং নিদ্রা। প্রমাদ মানে হলো কোনো কাজ ভুলভাবে করা বা যা করা উচিত নয় তা করা। আলস্য মানে হলো কাজ করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও বসে থাকা। আর নিদ্রা এখানে কেবল ঘুম নয়, এটি হলো চেতনার অচৈতন্য অবস্থা। এই তিনটি মিলে মানুষকে এক অন্ধকার কূপে বন্দি করে ফেলে।
বিস্তারিতভাবে দেখলে, তম গুণ হলো আত্মিক উন্নয়নের প্রধান বাধা। এটি একটি কালো রঙের দড়ি। তমোগুণী মানুষ সবসময় নেতিবাচক চিন্তা করে, সে খুব সহজে হাল ছেড়ে দেয় এবং সে সারাক্ষণ নেশা বা নিরর্থক ঘুমে ডুবে থাকতে চায়। কৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, তোমার মধ্যে যে বিষাদ বা এই পিছুটান দেখা যাচ্ছে, তার একটি অংশ হয়তো এই তম গুণের মোহ। তম গুণ মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। এটি আমাদের কোনো উন্নতি করতে দেয় না। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের সতর্ক করে দেয় যে যখনই আমাদের মধ্যে কোনো কাজ করার অনীহা আসবে বা আমরা নিজেদের ভুল পথে পরিচালিত করবো, তখনই বুঝতে হবে তম গুণ আমাদের আক্রমণ করেছে।
এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে আমাদের 'Inertia' বা জড়তার কথা বলছেন। বিজ্ঞান যেমন বলে একটি বস্তু স্থির থাকলে সে স্থিরই থাকতে চায়, তম গুণ আমাদের মনের সেই স্থবিরতা। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী আমাদের শেখায় যে আমাদের জীবনকে সচল ও সচেতন রাখতে হবে। এই শ্লোকটি আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটিই হলো আধ্যাত্মিক জাগরণ—অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো তম গুণের অন্ধকার থেকে বাঁচার উপায়। যখন আমরা সচেতন হই, তখনই তমের ক্ষমতা কমতে থাকে।
গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :
দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'The Ontology of Ignorance' (অজ্ঞানতার সত্তাতত্ত্ব) নিয়ে আলোচনা করে। এখানে 'মোহনং' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি সত্যকে গোপন করে এবং মিথ্যার ওপর প্রলেপ দেয়। দার্শনিক বিচারে তম গুণ হলো 'Darkness of Consciousness'। এটি সত্ত্ব গুণের ঠিক বিপরীত। সত্ত্ব গুণ যেখানে প্রকাশ করে, তম গুণ সেখানে আড়াল করে।
উদাহরণস্বরূপ, মেঘের কথা ভাবুন। মেঘ নিজে সূর্য নয়, কিন্তু সে সূর্যের আলোকে ঢেকে দেয়। তম গুণ হলো সেই ঘন মেঘ যা আমাদের আত্মার আলোকে ঢেকে রাখে। তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে আমাদের জীবনের প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত এই তমের প্রভাবে হয়। পাশ্চাত্য দর্শনে হাইডেগার (Heidegger) এর 'Inauthenticity' বা অসত্য অস্তিত্বের সাথে এর তুলনা করা যায়, যেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে জগতের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়।
তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে তম গুণ হলো আধ্যাত্মিক মৃত্যুর সমান। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত জরুরি কারণ তিনি অবসাদের (Depression) শিকার হচ্ছিলেন, যা তমের একটি রূপ। কৃষ্ণ তাকে কর্মের ও জ্ঞানের আলো দিয়ে সেই অন্ধকার থেকে বের করে আনছেন। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি কেবল এই জড়তা কাটিয়ে ওঠার মধ্যে নিহিত। যখন আমরা বুঝতে পারি যে আলস্য বা প্রমাদ আমাদের বন্ধু নয় বরং শত্রু, তখনই আমরা আমাদের প্রকৃত সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো অন্ধকারের ওপারে জ্যোতি।