॥ অধ্যায় ১৫, শ্লোক ১ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখা মশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্ ।
ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ ॥ ১৫.১ ॥

সরল ভাবার্থ:

শ্রীভগবান বললেন—এই জগৎ সংসার হলো একটি অবিনাশী অশ্বত্থ গাছের মতো, যার মূল বা শিকড় উপরের দিকে (ব্রহ্মে) এবং শাখাগুলি নিচের দিকে বিস্তৃত। বেদসমূহ এই বৃক্ষের পাতা। যিনি এই বৃক্ষটিকে জানেন, তিনিই প্রকৃত বেদবিৎ বা তত্ত্বজ্ঞানী।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

পঞ্চদশ অধ্যায়ের শুরুতেই শ্রীকৃষ্ণ এক বিস্ময়কর উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি সংসারকে একটি 'উল্টো অশ্বত্থ গাছ' (Inverted Tree) বলছেন। সাধারণ গাছের শিকড় নিচে থাকে, কিন্তু এই সংসার-বৃক্ষের শিকড় 'ঊর্ধ্বমূলম্' বা উপরে। এখানে 'উপর' মানে আকাশ নয়, বরং পরমেশ্বর বা ব্রহ্ম। কারণ এই জগতের সবকিছুর উৎস হলেন তিনি। শাখাগুলো 'অধঃশাখা' অর্থাৎ এই মর্ত্যলোকে ছড়িয়ে আছে। একে 'অব্যয়' বলা হয়েছে কারণ প্রবাহ হিসেবে এই সংসার অনন্তকাল ধরে চলছে; এর কোনো আদি বা অন্ত সাধারণ মানুষ খুঁজে পায় না।

বিস্তারিতভাবে দেখলে, কৃষ্ণ এখানে আমাদের চেনা জগতের স্বরূপ বিশ্লেষণ করছেন। গাছের পাতা যেমন গাছকে সজীব রাখে, তেমনি 'ছন্দাংসি' বা বেদের কর্মখণ্ড এই সংসারকে পুষ্ট করে। মানুষ বেদের কাম্যকর্মের প্রলোভনে পড়ে এই গাছের ডালপালায় ঘুরে বেড়ায়। কৃষ্ণ বলছেন, যে ব্যক্তি বুঝতে পারে এই গাছটি উল্টো—অর্থাৎ যার আসল শান্তি উপরে (পরমেশ্বরে) কিন্তু সে তা নিচে (বিষয়ে) খুঁজছে—সেই ব্যক্তিই প্রকৃত জ্ঞানী। আমরা যখন জলের প্রতিবিম্বে কোনো গাছ দেখি, তা উল্টো দেখায়। তেমনি এই মায়িক জগত হলো চিন্ময় জগতের একটি উল্টো প্রতিফলন মাত্র। অর্জুনকে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে, এই সংসার একটি মায়া, আর এর মূল শিকড় হলেন স্বয়ং ভগবান।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, কৃষ্ণ এখানে আমাদের চেতনার আমূল পরিবর্তনের কথা বলছেন। আমরা সাধারণত ডালপালা (ফল-মূল-সম্পদ) নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু শিকড়ের কথা ভুলে যাই। শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটি আমাদের শেখায় যে যদি মূল শিকড়ে জল দেওয়া হয় (ঈশ্বর ভজনা), তবে পুরো গাছটিই তৃপ্ত হয়। এই শ্লোকটি আমাদের সংসারের ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং এর দিব্য উৎসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন আমরা এই উল্টো রহস্যটি বুঝি, তখন আমাদের আসক্তি কমতে শুরু করে এবং আমরা প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাই। এটিই হলো বেদের চরম শিক্ষা।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোকটি 'The Cosmology of Reflection' বা প্রতিফলনের সৃষ্টিতত্ত্ব। উপনিষদে (কঠ উপনিষদ) এই অশ্বত্থ বৃক্ষের উল্লেখ আছে। 'অশ্বত্থ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো—যা আগামীকাল থাকবে না (অ-শ্ব-ত্থ)। অর্থাৎ এটি পরিবর্তনশীল জগতকে নির্দেশ করে। দার্শনিক বিচারে 'ঊর্ধ্ব' মানে হলো সচেতনতার সর্বোচ্চ স্তর বা পরমাত্মা। জগত হলো সেই পরমাত্মার এক নিম্নতর প্রকাশ বা প্রতিফলন।

উদাহরণস্বরূপ, একটি পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের প্রতিবিম্ব যেমন জলে উল্টো দেখায় এবং মূল গাছটি স্থির কিন্তু প্রতিবিম্বটি কাঁপতে থাকে, এই জগতও তেমনি ব্রহ্মের এক অস্থির প্রতিফলন। তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে আমাদের সব সমস্যার সমাধান রয়েছে মূলে ফিরে যাওয়ার মধ্যে। পাশ্চাত্য দর্শনে প্লেটোর (Plato) 'Allegory of the Cave' এর সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে ছায়া দেখে মানুষ সত্যকে বিচার করে। কৃষ্ণ এখানে সেই ছায়া বা প্রতিবিম্ব (সংসার) থেকে আসল বস্তুতে (ব্রহ্ম) ফেরার কথা বলছেন।

তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে সংসার জ্ঞান কেবল তথ্যের স্তূপ নয়, এটি হলো উৎসের সন্ধান। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর কারণ তিনি ডালপালার মায়ায় (আত্মীয়স্বজন) শিকড়কে (ধর্ম ও ঈশ্বর) ভুলে যাচ্ছিলেন। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি কেবল এই মায়ার জাল চেনার মধ্যে নিহিত। যখন আমরা বুঝতে পারি যে এই জগত একটি প্রতিফলিত সত্য মাত্র, তখন আমরা মূল সত্যের দিকে যাত্রা শুরু করি। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো পুরুষোত্তম যোগের প্রবেশদ্বার।