॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ১-৩ ॥

অর্জুন উবাচ ।
যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ ॥ ১৭.১ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা ।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু ॥ ১৭.২ ॥

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত ।
শ্রদ্ধাময়োঽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এৱ সঃ ॥ ১৭.৩ ॥

সরল ভাবার্থ:

১ নম্বর শ্লোক: অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন—হে কৃষ্ণ! যাঁরা শাস্ত্রীয় বিধান বা নিয়মাবলি ত্যাগ করে কেবল গভীর শ্রদ্ধার সাথে আরাধনা করেন, তাঁদের সেই নিষ্ঠা বা মানসিক স্থিতি ঠিক কেমন? তা কি সাত্ত্বিক, রাজসিক না কি তামসিক?

২ নম্বর শ্লোক: শ্রীভগবান উত্তর দিলেন—দেহধারী জীবদের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা তাদের অর্জিত গুণ অনুসারে তিন প্রকারের হয়: সাত্ত্বিকী, রাজসী এবং তামসী। সেই সম্পর্কে তুমি আমার কাছে সবিস্তারে শোনো।

৩ নম্বর শ্লোক: হে ভারত! প্রত্যেকের শ্রদ্ধা তার অন্তরের গুণের (সত্ত্বের) অনুরূপ হয়ে থাকে। প্রতিটি মানুষ আসলে তার বিশ্বাসের (শ্রদ্ধার) সমষ্টি মাত্র। যার যেমন শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস, সে ঠিক তেমনটিই হয় (অর্থাৎ তার ব্যক্তিত্ব সেই বিশ্বাসেই গঠিত হয়)।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

এই তিনটি শ্লোক আধ্যাত্মিক মনস্তত্ত্বের এক বিশাল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। অর্জুনের প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত—যদি কেউ শাস্ত্র না জানে কিন্তু তার মনে অগাধ ভক্তি থাকে, তবে তার স্থান কোথায়? কৃষ্ণ এখানে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উত্তর দিচ্ছেন। তিনি বলছেন যে শ্রদ্ধা কোনো আকাশ থেকে পড়া কোনো দৈব বস্তু নয়, এটি মানুষের স্বভাবজা বা অর্জিত স্বভাবের ফসল। আমাদের জীবনভর আমরা যে ধরনের চিন্তা করি, যে ধরনের কাজ করি এবং যে ধরনের সংশ্রবে থাকি, তা থেকেই আমাদের একটি নির্দিষ্ট স্বভাব তৈরি হয়। এই স্বভাবই নির্ধারণ করে আমরা কোন দিকে আকৃষ্ট হব।

বিস্তারিতভাবে দেখলে, কৃষ্ণ এখানে তিনটি গুণের প্রভাবকে মানুষের বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করেছেন। সাত্ত্বিক শ্রদ্ধা মানুষকে উচ্চতর সত্যের দিকে নিয়ে যায়, রাজসিক শ্রদ্ধা মানুষকে নাম-যশ এবং ক্ষমতার মোহে আবদ্ধ করে, আর তামসিক শ্রদ্ধা মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো—যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ। এর অর্থ হলো, আপনার বিশ্বাসই আপনার পরিচয়। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে জীবন কেবল ভোগের জন্য, তবে আপনার প্রতিটি আচরণ সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে আপনি পরমাত্মার অংশ, তবে আপনার আচরণে দিব্যতা ফুটে উঠবে। কৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে বাইরের শাস্ত্রীয় বিধির চেয়েও মনের ভেতরের এই গুণের ভারসাম্যটি বোঝা বেশি জরুরি।

এই বিশ্লেষণের গভীরে গেলে দেখা যায়, শ্রীকৃষ্ণের এই পরম বিজ্ঞান আমাদের জড় জগতের মায়া কাটিয়ে সত্যের এক পরম বিশালতায় নিয়ে যায়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের ব্যক্তিত্ব হলো আমাদের লালিত বিশ্বাসের এক একটি জীবন্ত প্রতিফলন। পাইথন প্রোগ্রামিংয়ে যেমন কোডের লজিক নির্ধারণ করে সফটওয়্যারটি কীভাবে কাজ করবে, তেমনি আমাদের ভেতরের 'শ্রদ্ধা' বা বিশ্বাস নামক কোডটিই আমাদের জীবনের আউটপুট নির্ধারণ করে। এই শ্লোকগুলো আমাদের শেখায় যে আমরা যদি আমাদের জীবন বদলাতে চাই, তবে আমাদের মূল বিশ্বাস বা শ্রদ্ধাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। এটিই হলো নিজেকে জানার প্রকৃত পথ। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়।

গভীর দার্শনিক তাৎপর্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ :

দার্শনিক প্রেক্ষাপটে এই শ্লোক তিনটি 'The Ontology of Human Faith' বা মানুষের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করে। এখানে 'শ্রদ্ধা' শব্দটি কোনো সাধারণ অন্ধ বিশ্বাস নয়; এটি হলো বুদ্ধির সেই একাগ্রতা যা আমাদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। দার্শনিক বিচারে মানুষের সচেতনতা বা 'Awareness' সর্বদাই কোনো না কোনো গুণের রঞ্জক দিয়ে রঙিন থাকে। 'সত্ত্বানুরূপা' বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে যে আমাদের অন্তঃকরণ বা চিত্তের গঠন যেমন, আমাদের জগত দেখার ভঙ্গিও ঠিক তেমনই হবে।

উদাহরণস্বরূপ, যেমন একটি লাল চশমা পরে পৃথিবীকে দেখলে সবকিছু লাল দেখায়, তেমনি যার মনে 'রজ' গুণের আধিপত্য আছে, সে মহৎ কাজের মধ্যেও নিজের স্বার্থ বা লাভের হিসাব খোঁজে। তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে মানুষ তার বিশ্বাসের দাস। পাশ্চাত্য দর্শনে জঁ-পল সার্ত্র্ (Sartre) যেমন বলেছিলেন Man is what he makes of himself, কৃষ্ণ এখানে এক ধাপ এগিয়ে বলছেন—মানুষ তা-ই হয় যা সে বিশ্বাস করে। কারণ মানুষের প্রতিটি সংকল্প এবং প্রতিটি কাজ তার শ্রদ্ধার দ্বারা পরিচালিত। এটি এক প্রকার 'Psychological Determinism', যেখানে আমাদের গুণের ভারসাম্যই আমাদের আধ্যাত্মিক গতি নির্ধারণ করে।

তাত্ত্বিকভাবে, এই শ্লোকটি নির্দেশ করে যে প্রকৃত রূপান্তর কেবল বাহ্যিক আচার-আচরণে নয়, বরং স্বভাবের পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত। অর্জুনের জন্য এই দর্শনটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর কারণ তিনি তাঁর মোহগ্রস্ত বিশ্বাসের কারণে বিষাদগ্রস্ত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ তাঁকে দেখালেন যে তাঁর এই শোক আসলে তাঁর গুণের প্রভাব মাত্র। এই দার্শনিক সত্যটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ ও শান্তি কেবল সাত্ত্বিক শ্রদ্ধায় স্থিত হওয়ার মধ্যে নিহিত। যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের জগতটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের একটি প্রজেকশন মাত্র, তখনই আমরা প্রকৃত স্বাধীনতার পথ খুঁজে পাই। শ্রীকৃষ্ণের এই বর্ণনা আমাদের মায়ার পর্দা সরিয়ে সত্যের এক পরম শান্তিতে নিয়ে যায়। এটিই হলো পুরুষোত্তমকে জানার আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি।