॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ২ ॥

শ্রীভগবানুবাচ ।
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা ।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু ॥ ২ ॥

সরল ভাবার্থ

শ্রীভগবান বললেন—মানুষের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা তিন প্রকারের হয়ে থাকে: সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী। এই বিষয়ে এখন শ্রবণ করো।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলছেন যে, মানুষের শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস কোনো আলাদা বস্তু নয়, বরং এটি তার 'স্বভাবজা' অর্থাৎ তার অর্জিত স্বভাব থেকে উৎপন্ন হয়। প্রতিটি মানুষের ভেতর প্রকৃতির তিনটি গুণ—সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ বিদ্যমান। মানুষের সংস্কার, কর্ম এবং চিন্তা অনুযায়ী এই গুণগুলোর একটি প্রধান হয়ে ওঠে এবং সেটাই তার শ্রদ্ধার ধরন নির্ধারণ করে।

১. সাত্ত্বিকী শ্রদ্ধা: যা পবিত্রতা, জ্ঞান এবং মঙ্গলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এমন মানুষ সত্য ও ঈশ্বরীয় বিধানে বিশ্বাস রাখে। ২. রাজসী শ্রদ্ধা: যা দম্ভ, খ্যাতি এবং ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে। এমন মানুষ শক্তি এবং জাঁকজমকপূর্ণ পুজোয় বিশ্বাস রাখে। ৩. তামসী শ্রদ্ধা: যা অজ্ঞানতা, অন্ধবিশ্বাস এবং ক্ষতিকর প্রবৃত্তি থেকে উৎপন্ন হয়। এমন মানুষ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে স্পষ্ট করছেন যে, কেবল 'শ্রদ্ধা' থাকলেই হয় না, সেই শ্রদ্ধার উৎসটি কী—তা দেখা জরুরি। আমাদের বিশ্বাসই বলে দেয় আমরা আসলে কেমন মানুষ। এই শ্লোকটি আমাদের আত্মদর্শনের সুযোগ করে দেয়। আমরা যা কিছুকে শ্রদ্ধা করি বা বিশ্বাস করি, তা কি আমাদের আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে নাকি অন্ধকারের দিকে? মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে তার বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। এটি কোনো ধ্রুবক বিষয় নয়; বরং সাধনার মাধ্যমে মানুষ তামসিক শ্রদ্ধা থেকে সাত্ত্বিক শ্রদ্ধার দিকে উত্তরণ ঘটাতে পারে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: শ্রদ্ধা হলো আমাদের চেতনার আয়না। আমরা যেমন প্রকৃতির গুণের অধীন হই, আমাদের বিশ্বাসও তেমনই আকার ধারণ করে। নিজের স্বভাব পরিবর্তন করলেই শ্রদ্ধার গুণগত মান পরিবর্তন সম্ভব।