॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ॥

অধ্যায় ১৭: শ্রদ্ধা ত্রয় বিভাগ যোগ (মোট ২৮ টি শ্লোক)

॥ শ্লোক ১৭.১ ॥

অর্জুন উবাচ ।
যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ ॥

অনুবাদ: অর্জুন বললেন: হে কৃষ্ণ, যারা শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে যজ্ঞাদি করে, তাদের সেই নিষ্ঠা কী প্রকার— সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২ ॥

শ্রীভগবান্ উবাচ ।
ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা ।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু ॥

অনুবাদ: শ্রীভগবান্ বললেন: দেহধারী প্রাণীদের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা তিন প্রকার হয়— সাত্ত্বিকী, রাজসী এবং তামসী। সেই বিষয়ে আমার থেকে শোনো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৩ ॥

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত ।
শ্রদ্ধাময়োঽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ ॥

অনুবাদ: হে ভারত, সকল মানুষের শ্রদ্ধাই তার স্বভাব অনুযায়ী হয়ে থাকে। এই পুরুষ শ্রদ্ধাময়; তাই মানুষ যেমন শ্রদ্ধা পোষণ করে, সে তেমনই হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৪ ॥

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ ॥

অনুবাদ: সাত্ত্বিক মানুষেরা দেবতাদের পূজা করে; রাজসিকেরা যক্ষ ও রাক্ষসদের পূজা করে; আর তামসিক মানুষেরা প্রেত এবং ভূত-গণদের পূজা করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৫-৬ ॥

অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ ।
দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ ॥
কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ ।
মাং চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্ বিদ্ধ্যসুরনিশ্চয়ান্ ॥

অনুবাদ: যারা শাস্ত্রের বিধি না মেনে দম্ভ ও অহঙ্কারে যুক্ত হয়ে, কাম, আসক্তি ও বলের বশবর্তী হয়ে ঘোর তপস্যা করে, তারা তাদের দেহস্থ ভূতসমূহকে এবং দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত আমাকেও কষ্ট দেয়। সেই অজ্ঞানীদের তুমি আসুরিক নিশ্চয়তাযুক্ত বলে জানিও।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৭ ॥

আহারস্ত্বপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ ।
যজ্ঞস্তপস্ তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু ॥

অনুবাদ: সকলের প্রিয় আহারও তিন প্রকার হয়। তেমনি যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানও তিন প্রকারের। তাদের এই ভেদ আমার থেকে শোনো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৮ ॥

আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ ॥

অনুবাদ: যেসকল আহার আয়ু, বুদ্ধি, বল, আরোগ্য, সুখ এবং প্রীতি বর্ধনকারী, রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থির এবং মনোরম, সেই আহার সাত্ত্বিক মানুষের প্রিয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.৯ ॥

কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরূক্ষবিদাাহিনঃ ।
আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোেকাময়প্রদাঃ ॥

অনুবাদ: যে আহার অতিরিক্ত তিক্ত, টক, লবণাক্ত, উষ্ণ, তীক্ষ্ণ, রুক্ষ এবং দাহকারী, যা দুঃখ, শোক ও রোগ উৎপন্ন করে— সেই আহার রাজসিক মানুষের প্রিয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১০ ॥

যাতযামং গতরসং পূতি পর্যষিতং চ যৎ ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্য়ং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্ ॥

অনুবাদ: যা এক প্রহর অতীত, স্বাদহীন, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসি, উচ্ছিষ্ট এবং অপবিত্র— সেই ভোজন তামসিক মানুষের প্রিয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১১ ॥

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যজ্ঞো বিধিদিষ্টো য ইজ্যতে।
যষ্টব্যমেবেতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ

অনুবাদ: যারা ফলাকাঙ্ক্ষী নন, শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী 'যজ্ঞ করা কর্তব্য' এই মনঃস্থির করে যে যজ্ঞ করেন, তা সাত্ত্বিক যজ্ঞ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১২ ॥

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভার্থমপি চৈব য়ৎ ।
ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্ ॥

অনুবাদ: হে ভরতশ্রেষ্ঠ, যে যজ্ঞ ফল লাভের ইচ্ছা বা দম্ভ দেখানোর জন্য করা হয়, সেই যজ্ঞকে তুমি রাজসিক বলে জানিও।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৩ ॥

বিধিহীনম্সৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনম্ অদঙ্ক্ষিণম্ ।
শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে ॥

অনুবাদ: শাস্ত্রবিধিহীন, অন্নদানবিহীন, মন্ত্রহীন, দক্ষিণাহীন এবং শ্রদ্ধাহীন যজ্ঞকে তামসিক বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৪ ॥

দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচম্ আর্জবম্ ।
ব্রহ্মচর্যম্ অহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে ॥

অনুবাদ: দেব, দ্বিজ, গুরু এবং জ্ঞানীদের পূজা; পবিত্রতা, সরলতা, ব্রহ্মচর্য এবং অহিংসা— এগুলোকে শারীরিক তপস্যা বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৫ ॥

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ
স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে ॥

অনুবাদ: যে বাক্য অন্যকে উদ্বেগরহিত করে, যা সত্য, প্রিয় এবং হিতকর, এবং বেদাভ্যাস— এগুলোকে বাচিক তপস্যা বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৬ ॥

মনঃপ্রসাদঃ সৌম্যত্বং মৌনম্ আত্মবিনিগ্রহঃ ।
ভাবসং শুদ্ধির ইত্যেতৎ তপ মানসম্ উচ্যতে ॥

অনুবাদ: মনের প্রসন্নতা, শান্তভাব, মৌনতা, আত্মসংযম এবং ভাবের (চিত্তের) শুদ্ধি— এগুলোকে মানসিক তপস্যা বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৭ ॥

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপস্তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।
অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।

অনুবাদ: ফলাকাঙ্ক্ষী নন এমন যুক্ত ব্যক্তিরা পরম শ্রদ্ধা সহকারে যে এই তিন প্রকার তপস্যা করেন, তাকে সাত্ত্বিক তপস্যা বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৮ ॥

সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ ।
ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলম্ অধ্রুবম্ ॥

অনুবাদ: সৎকার (সম্মান), মান বা পূজা পাওয়ার জন্য দম্ভের সঙ্গে যে তপস্যা করা হয়, ইহলোকে তাকে রাজসিক, চঞ্চল এবং অনিত্য বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.১৯ ॥

মূঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ ।
পরস্যোৎসাদনার্থং বা তত্তামসম্ উদাহৃতম্ ॥

অনুবাদ: যে তপস্যা মূর্খতাবশত নিজের শরীরকে কষ্ট দিয়ে অথবা অন্যের বিনাশের জন্য করা হয়, তাকে তামসিক তপস্যা বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২০ ॥

দাতব্যম্ ইতি যদ্দানং দীয়তেঽনুপকারিণে ।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্ দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্ ॥

অনুবাদ: দান করা কর্তব্য— এই মনে করে, প্রত্যুপকারের আশা না করে, উপযুক্ত দেশ, কাল এবং পাত্রে যে দান করা হয়, তাকে সাত্ত্বিক দান বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২১ ॥

যত্তু প্রত্যুপকারার্থং ফলম্ উদ্দিশ্য বা পুনঃ ।
দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্ দানং রাজসং স্মৃতম্ ॥

অনুবাদ: কিন্তু প্রত্যুপকারের উদ্দেশ্য নিয়ে অথবা ফল লাভের আশা করে কষ্ট সহকারে যে দান করা হয়, তাকে রাজসিক দান বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২২ ॥

অদেশকালে যদ্দানম অপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে ।
অসত্কৃতম্ অবজ্ঞাতং তত্তামসম্ উদাহৃতম্ ॥

অনুবাদ: অনুপযুক্ত দেশ ও কালে, অযোগ্য পাত্রে, অসম্মান সহকারে এবং অবজ্ঞা ভরে যে দান করা হয়, তাকে তামসিক দান বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২৩ ॥

ওঁ তৎসাদিতি ইতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ ত্রিবধঃ স্মৃতঃ ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ য়জ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা ॥

অনুবাদ: 'ওঁ তৎ সৎ'— এই তিনটি ব্রহ্মের নির্দেশক শব্দ বলে কথিত। এই তিনটি শব্দ দ্বারা পূর্বে ব্রাহ্মণ, বেদ এবং যজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছিল।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২৪ ॥

তস্মাদ্ ওঁ ইত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ ।
প্রবর্তন্তে বিধানোেক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্ ॥

অনুবাদ: সেই কারণে ব্রহ্মবাদীদের শাস্ত্রোক্ত যজ্ঞ, দান এবং তপস্যাদি ক্রিয়া সর্বদা 'ওঁ' উচ্চারণ করে শুরু হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২৫ ॥

তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ ।
দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোেক্ষকাঙ্ঙ্ক্ষিভিঃ ॥

অনুবাদ: 'তৎ' (অর্থাৎ সেই ব্রহ্ম) এই কথা বলে, মোক্ষকামী ব্যক্তিরা ফল লাভের আশা না করে নানা প্রকারের যজ্ঞ, তপস্যা ও দানক্রিয়া করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২৬-২৭ ॥

সদ্ ভাবে সাধুভাবে চ সদ্ ইত্যেতদ্ প্রযুজ্যতে ।
প্রশস্তে কর্মণি তথা সচ্ছব্দঃ পার্থ য়ুজ্যতে ॥
যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিশ্ সদ্ ইতি চোচ্যতে ।
কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদ্ ইত্যেবাভিধীয়তে ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, 'সৎ' শব্দটি সত্য এবং শ্রেষ্ঠ অর্থে ব্যবহৃত হয়। তেমনই শুভ কর্মেও 'সৎ' শব্দটি প্রযুক্ত হয়। যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানে যে দৃঢ়তা, তাকেও 'সৎ' বলা হয়। আর সেই পরব্রহ্মের উদ্দেশ্যে যে কর্ম করা হয়, তাকেও 'সৎ' বলা হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ১৭.২৮ ॥

অশ্রদ্ধয়া হতং দত্তং তপস্ তপ্তং কৃতং চ য়ৎ ।
অসদ্ ইত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তত্ প্রেত্য নো ইহ ॥

অনুবাদ: হে পার্থ, অশ্রদ্ধার সঙ্গে যা কিছু হোম করা হয়, দান করা হয়, তপস্যা করা হয় অথবা অন্য কোনো কাজ করা হয়, তা 'অসৎ' বলে অভিহিত হয়। তা ইহলোক বা পরলোক— কোথাও ফলপ্রসূ হয় না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে শ্রদ্ধা ত্রয় বিভাগ যোগো নাম সপ্তদশোঽধ্যায়ঃ ॥

এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা উপনিষদের ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সংবাদে 'শ্রদ্ধা ত্রয় বিভাগ যোগ' নামক সপ্তদশ অধ্যায় সমাপ্ত হলো।