॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ১৪ ॥

দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচমর্জবম্ ।
ব্রহ্মচর্যমহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে ॥ ১৪ ॥

সরল ভাবার্থ

দেবতা, ব্রাহ্মণ (ব্রহ্মজ্ঞানী), গুরু ও জ্ঞানীদের পূজা; এবং শৌচ (পবিত্রতা), সারল্য, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসাকে শারীরিক তপস্যা বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'শারীরিক তপস্যা'র এক অতি আধুনিক ও উন্নত সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তপস্যা মানে কেবল বনে গিয়ে অনাহারে থাকা নয়, বরং নিজের শরীর ও কর্মকে উচ্চতর আদর্শে পরিচালনা করা।

এই শ্লোকে শারীরিক তপস্যার প্রধান পাঁচটি অঙ্গ বলা হয়েছে। প্রথমত, 'পূজনং'—অর্থাৎ শ্রদ্ধেয়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। যারা আমাদের আলোর পথ দেখান (দেবতা, গুরু ও জ্ঞানী), তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হলো শরীরের প্রথম ধর্ম। দ্বিতীয়ত, 'শৌচম'—বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা। শরীরকে রোগমুক্ত ও পবিত্র রাখা এর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত, 'অর্জবম্' বা সারল্য—কথায় ও কাজে এক থাকা, কোনো প্রকার কুটিলতা না করা। চতুর্থত, 'ব্রহ্মচর্য'—যৌন সংযম এবং শরীরের শক্তিকে আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক কাজে ব্যয় করা। পঞ্চমত, 'অহিংসা'—কায়মনোবাক্যে কোনো প্রাণীকে কষ্ট না দেওয়া।

এই গুণগুলো অর্জন করা শরীরের জন্য এক প্রকার কঠিন সাধনা বা তপস্যা। কারণ মানুষের ইন্দ্রিয় স্বাভাবিকভাবে ভোগ ও আলস্যের দিকে ধাবিত হয়। যখন আমরা সজ্ঞানে আমাদের ইন্দ্রিয়কে সংযত করে এই শুভ কাজগুলোতে নিযুক্ত করি, তখনই তা প্রকৃত তপস্যায় পরিণত হয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের শরীর হলো ঈশ্বরের মন্দির; একে অনাচার বা অপবিত্রতায় নষ্ট করা পাপ। শরীরের শক্তিকে সেবায় এবং শুদ্ধাচারে নিয়োগ করাই হলো জীবনের সার্থকতা। এটি মানুষকে কেবল শারীরিক সুস্থতাই দেয় না, বরং মানসিক দৃঢ়তাও প্রদান করে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: শরীর হলো কর্মের প্রধান যন্ত্র। একে পবিত্র রাখা এবং মহৎ কাজে উৎসর্গ করাই হলো শ্রেষ্ঠ শারীরিক সাধনা। অহিংসা ও ব্রহ্মচর্যই হলো প্রকৃত বীরত্বের লক্ষণ।