সরল ভাবার্থ
'সৎ' এই শব্দটি 'অস্তিত্ব' বা 'পরম সত্য' অর্থে এবং 'সাধুভাব' বা 'শ্রেষ্ঠত্ব' অর্থে ব্যবহৃত হয়। হে পার্থ! একইভাবে কোনো মঙ্গলজনক বা প্রশংসনীয় কর্মের ক্ষেত্রেও 'সৎ' শব্দটি প্রযুক্ত হয়। যজ্ঞ, তপস্যা ও দানে যে অবিচল নিষ্ঠা, তাকেও 'সৎ' বলা হয় এবং পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত যেকোনো কর্মকেও 'সৎ' বলে অভিহিত করা হয়।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
'ওঁ তৎ সৎ' মন্ত্রের চূড়ান্ত অংশ হলো 'সৎ'। এই দুটি শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ 'সৎ' শব্দের ব্যবহারিক ও পারমার্থিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। সংস্কৃত ভাষায় 'সৎ' শব্দের একটি অর্থ হলো যা চিরকাল বিদ্যমান বা অবিনশ্বর (অস্তিত্ব)। পরমাত্মা ছাড়া এই জগতে আর কিছুই চিরস্থায়ী নয়, তাই তিনিই প্রকৃত 'সৎ'। দ্বিতীয়ত, এই শব্দটি উন্নত চরিত্র বা 'সাধুভাব' প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো মানুষ দয়া, ক্ষমা বা সত্যের পথে চলে, তখন তাকে বলা হয় 'সৎ মানুষ'।
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যখন আমরা কোনো মহৎ বা শুভ কাজ করি (প্রাশস্তে কর্মণি), তখন সেই কাজের সাথে 'সৎ' শব্দটি যুক্ত করে আমরা সেই কর্মকে পবিত্রতা দান করি। যজ্ঞ, দান বা তপস্যার মতো আধ্যাত্মিক সাধনায় যখন একজন সাধক স্থির ও অটল থাকেন (স্থিতিঃ), তখন তাঁর সেই একাগ্রতাকে 'সৎ' বলা হয়। এর মানে হলো, কাজের বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের নিষ্ঠা বা স্থিতিই বড়।
সবশেষে বলা হয়েছে, 'তদর্থীয়ং কর্ম'—অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রীতির জন্য বা জগতের কল্যাণে যা কিছু করা হয়, তার সবকিছুই 'সৎ'। আমরা যখন রান্না করি, পড়াশোনা করি বা সেবা করি, যদি আমাদের মনে এই ভাব থাকে যে এটি সেই পরম সত্যের আরাধনা, তবে সেই সাধারণ কর্মটিও 'সৎ' কর্মে রূপান্তরিত হয়। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে দিব্য বা পবিত্র করে তোলা সম্ভব। 'সৎ' শব্দের স্মরণে আমাদের চিত্ত শুদ্ধ হয় এবং আমাদের কর্ম আসক্তি মুক্ত হয়ে পরমাত্মার চরণে অর্পিত হয়। যা সত্য, যা মঙ্গলময় এবং যা সুন্দর—তার সাথে নিজেকে যুক্ত করাই হলো 'সৎ' সাধনা।
তাত্ত্বিক গভীরতা: 'সৎ' হলো সেই সংযোগকারী সূত্র যা আমাদের ক্ষুদ্র কর্মকে অনন্ত পরমাত্মার সাথে যুক্ত করে। যা কিছু পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, কেবল তাই অবিনশ্বর বা 'সৎ'। বাকি সবকিছু মায়ার বশবর্তী ও নশ্বর।