॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ৫-৬ ॥

অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ ।
দম্ভাহংকারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ ॥ ৫ ॥
কর্ষয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ ।
মাং চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্ ॥ ৬ ॥

সরল ভাবার্থ

যারা দম্ভ ও অহংকারযুক্ত হয়ে এবং কাম ও আসক্তির বশবর্তী হয়ে শাস্ত্র-বহির্ভূত ঘোর তপস্যা করে এবং শরীরের পঞ্চভূত ও অন্তর্যামী আমাকে কষ্ট দেয়, তাদের আসুরিক স্বভাবের বলে জানবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোক দুটিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এক ধরনের ছদ্ম-আধ্যাত্মিকতার পর্দা ফাঁস করেছেন। অনেক সময় দেখা যায় কিছু মানুষ অত্যন্ত কঠিন এবং ভয়ংকর কৃচ্ছ্রসাধন করে—যেমন রোদে দাঁড়িয়ে থাকা বা শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করা—কেবলমাত্র লোকদেখানোর জন্য বা অলৌকিক ক্ষমতা লাভের আশায়। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যদি এই তপস্যা 'অশাস্ত্রবিহিত' হয়, অর্থাৎ যার কোনো গঠনমূলক বা আধ্যাত্মিক ভিত্তি নেই, তবে তা আসুরিক।

এই ধরনের তপস্যার পেছনে কাজ করে 'দম্ভ' (লোকদেখানো ভাব) এবং 'অহংকার'। তারা মনে করে শরীরকে কষ্ট দিলেই পুণ্য অর্জন হবে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, শরীর হলো পঞ্চভূতের তৈরি একটি মন্দির যেখানে পরমাত্মা স্বয়ং বাস করেন। যারা মূর্খতাবশত নিজের শরীরকে অনাহারে বা যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট করে (কর্ষয়ন্তঃ), তারা আসলে শরীরের ভেতরের সেই মহাজাগতিক শক্তি এবং অন্তর্যামী পরমেশ্বরকেই কষ্ট দেয়। এটি কোনো আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং এটি হলো অজ্ঞতা ও নিষ্ঠুরতা।

প্রকৃত ধর্ম হলো শরীরের যত্ন নেওয়া এবং তাকে ঈশ্বরের সেবায় ব্যবহার করা, তাকে অযথা পীড়ন করা নয়। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, ধর্মের নামে উগ্রতা বা নিজের ক্ষতি করা ঈশ্বর পছন্দ করেন না। যারা নিজের অহং চরিতার্থ করার জন্য ধর্মকে হাতিয়ার বানায় এবং শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে অধর্ম করে, তারা আসুরিক মানসিকতার অধিকারী। আধ্যাত্মিক পথ হতে হবে সংযমের, নির্যাতনের নয়। এই ভারসাম্য বুঝতে পারাই হলো প্রকৃত জ্ঞানের লক্ষণ। আমাদের মনে রাখা উচিত, ভক্তি আসে হৃদয়ের শুদ্ধতায়, শরীরের ওপর অহেতুক চাবুক চালিয়ে নয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: শরীর হলো ভগবানের দেওয়া শ্রেষ্ঠ যন্ত্র। একে বিকল করা মানে স্রষ্টাকে অপমান করা। আসুরিক শক্তি সবসময় ধ্বংসাত্মক, এমনকি তা যখন ধর্মের ছদ্মবেশে আসে। আত্মসংযম ও আত্মনিগ্রহের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।