॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ২১ ॥

যত্তু প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ ।
দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্ ॥ ২১ ॥

সরল ভাবার্থ

কিন্তু যে দান প্রত্যুপকারের আশায় (বিনিময় পাওয়ার উদ্দেশ্যে), ফলের আকাঙ্ক্ষা করে অথবা অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনুতাপের সাথে করা হয়, তাকে রাজসিক দান বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

রাজসিক দান আসলে কোনো দান নয়, এটি এক প্রকার জাগতিক লেনদেন বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। এখানে দাতা সবসময় চিন্তা করেন—আমি আজ একে সাহায্য করছি, ভবিষ্যতে এ আমার কী কাজে আসবে? অর্থাৎ 'প্রত্যুপকার' বা প্রতিদানের আশা এখানে প্রবল। রাজসিক ব্যক্তি অনেক সময় সমাজের চাপে পড়ে বা লোকলজ্জার ভয়ে দান করেন, কিন্তু দেওয়ার সময় তাঁর মনে এক প্রকার কষ্ট বা কার্পণ্য কাজ করে (পরিক্লিষ্টং)। দান করার পর তিনি অনেক সময় অনুশোচনা করেন যে, কেন এত টাকা খরচ করলাম!

এই ধরনের দানের আরেকটি বড় লক্ষণ হলো 'ফলমুদ্দিশ্য'—অর্থাৎ পরকালে স্বর্গলাভ বা ইহকালে কোনো বড় ফলের আশা রাখা। এখানে স্বার্থ সিদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য। রাজসিক দাতা চান তাঁর দানের খবর সংবাদপত্রে আসুক বা মানুষ তাঁর জয়জয়কার করুক। যেহেতু এই দান হৃদয়ের ঔদার্য থেকে আসে না, তাই এটি দাতার আত্মিক উন্নতি ঘটাতে পারে না। এটি কেবল তাঁর অহংকারকে তুষ্ট করে।

শাস্ত্র মতে, যে হাতে দান করা হয়, অন্য হাত যেন তা জানতে না পারে—এটিই হলো প্রকৃত দানের আদর্শ। কিন্তু রাজসিক দানে ঢাকঢোল পেটানোর প্রবণতা থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের এই ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার শিক্ষা দিয়েছেন। রাজসিক দান মানুষকে মায়ার বন্ধনে আরও বেশি আবদ্ধ করে রাখে। আমরা যদি প্রতিদানের আশা নিয়ে কাউকে কিছু দিই, তবে সেই দানে আধ্যাত্মিক তেজ থাকে না। দান হতে হবে মুক্ত হস্তে এবং আনন্দিত চিত্তে। যখন আমরা মন থেকে কিছু ছাড়তে পারি না কিন্তু সম্মানের লোভে দিই, তখন তা রাজসিকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: বিনিময়ের আশা ত্যাগের মহিমাকে ম্লান করে দেয়। রাজসিক দান হলো অহংকারের খোরাক। যা মন থেকে বিসর্জন দেওয়া যায় না, তা কখনও ঈশ্বরীয় হতে পারে না।