॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ১৮ ॥

সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ ।
ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্ ॥ ১৮ ॥

সরল ভাবার্থ

সম্মান, খ্যাতি ও পূজা লাভের উদ্দেশ্যে দম্ভ সহকারে যে তপস্যা করা হয়, তাকে রাজসিক তপস্যা বলা হয়। এটি অস্থির এবং অনিত্য।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

রাজসিক তপস্যার মূলে থাকে 'অহং' বা দম্ভ। এখানে সাধনার চেয়ে প্রদর্শন বড় হয়ে ওঠে। রাজসিক ব্যক্তি তপস্যা করেন যাতে সমাজে তিনি একজন বড় ধার্মিক বা ত্যাগী পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি পান। তিনি চান মানুষ তাঁর প্রশংসা (সৎকার) করুক, তাঁকে শ্রদ্ধা (মান) করুক এবং তাঁর পাদপূজা করুক।

শ্রীকৃষ্ণ এই ধরনের তপস্যাকে 'চলমধ্রুবম্'—অর্থাৎ অস্থির ও ক্ষণস্থায়ী বলেছেন। কারণ যখনই প্রশংসার স্রোত বন্ধ হয়ে যায়, তখনই তাঁর তপস্যার আগ্রহও হারিয়ে যায়। রাজসিক তপস্যা কোনো স্থায়ী আধ্যাত্মিক শান্তি দিতে পারে না। এটি একটি অভিনয়ের মতো, যেখানে দর্শক হাততালি দেওয়া বন্ধ করলে অভিনেতাও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই ধরনের মানুষ অনেক সময় উপবাস বা কৃচ্ছ্রসাধন করেন কেবল ক্ষমতার দম্ভে বা অন্যকে ছোট করার মানসিকতায়।

এই শ্লোকটি আমাদের বর্তমান সমাজের লোকদেখানো ভক্তির এক নিদারুণ বর্ণনা। রাজসিক কর্ম কেবল জাগতিক লাভ বা খ্যাতির পেছনে ছোটে। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো বিনয় এবং আত্মসমর্পণ। রাজসিক তপস্যা অহংকারকে কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেয়। তাই এটি মুক্তি দিতে অক্ষম। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সতর্ক করছেন যে, আমরা যদি কোনো মহৎ কাজ করি কিন্তু তার ভেতরে সম্মানের প্রত্যাশা রাখি, তবে সেই কাজের পুণ্য বা তেজ নষ্ট হয়ে যায়। নিঃস্বার্থতাই কর্মের প্রাণ, দম্ভ হলো তার বিষ।
তাত্ত্বিক গভীরতা: খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা হলো আধ্যাত্মিক পচনের প্রথম ধাপ। রাজসিক তপস্যা কেবল শরীরের ওপর নির্যাতন, আত্মার জাগরণ নয়। যা অনিত্য ফলের আশা করে, তা ঈশ্বরীয় হতে পারে না।