॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ১৯ ॥

মূঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ ।
পরস্যোৎসাদনার্থং বা তত্তামসমুদাহৃতম্ ॥ ১৯ ॥

সরল ভাবার্থ

মূঢ়তাবশত নিজের শরীরকে কষ্ট দিয়ে অথবা অন্যের বিনাশের উদ্দেশ্যে যে তপস্যা করা হয়, তাকে তামসিক তপস্যা বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

তামসিক তপস্যা হলো অজ্ঞতা এবং ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে 'মূঢ়গ্রাহেণ' বলতে নির্বোধ জেদ বা অন্ধ বিশ্বাসকে বোঝানো হয়েছে। তামসিক ব্যক্তি মনে করেন যে, নিজের শরীরকে যত বেশি যন্ত্রণা দেবেন, তত বেশি আধ্যাত্মিক শক্তি পাবেন। এটি আসলে এক প্রকার আত্মপীড়ন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইতিপূর্বেই বলেছেন যে, শরীর হলো ভগবানের অধিষ্ঠান; তাই একে অকারণে কষ্ট দেওয়া আসলে ঈশ্বরকেই কষ্ট দেওয়া।

তামসিক তপস্যার আরেকটি জঘন্য দিক হলো 'পরস্যোৎসাদনার্থং'—অর্থাৎ অন্যের ক্ষতি বা বিনাশ করার উদ্দেশ্যে করা সাধনা। ইতিহাসে আমরা অনেক অসুর বা অশুভ শক্তির উদাহরণ পাই, যারা কঠোর তপস্যা করেছিল কেবল অমর হওয়ার জন্য বা অন্যকে ধ্বংস করার বর পাওয়ার জন্য। এটি ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত পথ। যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে অধর্মের পরিকল্পনা করা হয়, তখনই তা তামসিকতায় রূপান্তরিত হয়।

এই ধরনের তপস্যায় না আছে ভক্তি, না আছে শাস্ত্রীয় জ্ঞান। এটি কেবল অন্ধকার এবং হিংসা প্রচার করে। আধুনিক যুগেও যদি কেউ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে নিজের অঙ্গহানি করে বা অন্যের অমঙ্গল কামনায় কোনো তান্ত্রিক ক্রিয়া বা নেতিবাচক চিন্তা করে, তবে তা এই তামসিক তপস্যার অন্তর্ভুক্ত। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সতর্ক করছেন যে, আলো এবং আঁধারের পার্থক্য বুঝতে হবে। আধ্যাত্মিকতা মানে প্রেম এবং সেবা, যন্ত্রণা বা ধ্বংস নয়। তামসিক পথ মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে তোলে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: জ্ঞানহীন কষ্ট তপস্যা নয়, তা নির্বুদ্ধিতা। অন্যের অকল্যাণে প্রযুক্ত শক্তি নিজেরই বিনাশ ডেকে আনে। সত্যকার ধর্ম সবসময় গঠনমূলক, কখনও ধ্বংসাত্মক নয়।