সরল ভাবার্থ
ফলের আশা না করে 'তৎ' (অর্থাৎ সবকিছুই সেই পরমেশ্বরের) এই শব্দ উচ্চারণ করে মোক্ষকামী ব্যক্তিগণ বিবিধ যজ্ঞ, তপস্যা ও দানরূপ কর্মসমূহ সম্পাদন করেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
'তৎ' শব্দের অর্থ হলো 'সেই'। এখানে 'সেই' বলতে পরমেশ্বরকে বোঝানো হয়েছে যিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে। শ্রীকৃষ্ণ মোক্ষ বা মুক্তি লাভের একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি এই শ্লোকে বর্ণনা করেছেন। যারা জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি চান, তারা যজ্ঞ, তপস্যা বা দান করার সময় 'তৎ' শব্দটি উচ্চারণ করেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই কর্মের ফল আমার নয়, বরং 'তৎ' বা সেই পরমাত্মার।
আধ্যাত্মিক জীবনে ফলের প্রতি আসক্তিই হলো মূল বন্ধন। যখন কেউ কোনো কাজ করার সময় ভাবে—এটি সেই পরমেশ্বরের সেবা, তখন সে ফলের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এই মানসিক অবস্থাকেই 'নিষ্কাম কর্ম' বলা হয়। 'তৎ' শব্দটির প্রয়োগ আমাদের অহংকারকে বশীভূত করতে সাহায্য করে। এটি কর্মের কর্তৃত্ব (Doership) থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়। সাধক বুঝতে পারেন যে, শরীর ও মনের মাধ্যমে যে কর্ম হচ্ছে, তা আসলে প্রকৃতির এবং পরমাত্মার লীলা।
এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, ত্যাগের প্রকৃত অর্থ কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং কাজের ফলের ওপর অধিকার ছেড়ে দেওয়া। 'তৎ' উচ্চারণ করার অর্থ হলো নিজের ক্ষুদ্র সত্তাকে মহাজাগতিক সত্তার চরণে সমর্পণ করা। এই নিরভিমান মানসিকতাই মানুষকে প্রকৃত শান্তির দিকে নিয়ে যায়। দান বা সেবা করার সময় যখন আমরা 'তৎ' ভাবটি বজায় রাখি, তখন সেই কাজটিতে কোনো স্বার্থ থাকে না। এটি কেবল মোক্ষকামী বা মুমুক্ষুদের জন্যই নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জন্যই এক মহান জীবনদর্শন। সব কিছু ভগবানের এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই আমি কর্ম করছি—এই ভাবই জীবনের সব দুঃখের অবসান ঘটায়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: 'তৎ' হলো সমর্পণের নাম। ফলের আশা ত্যাগ করলেই কর্ম বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কাজের মালিকানা যখন ঈশ্বরের চরণে অর্পণ করা হয়, তখন প্রতিটি কাজই একটি উপাসনায় পরিণত হয়।