॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ২৩ ॥

ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা ॥ ২৩ ॥

সরল ভাবার্থ

'ওঁ', 'তৎ' এবং 'সৎ'—এই তিনটি হলো ব্রহ্মের (পরমাত্মার) ত্রিবিধ নির্দেশক নাম। সৃষ্টির আদিতে এই নামগুলো দ্বারাই ব্রাহ্মণগণ, বেদসমূহ এবং যজ্ঞসমূহ বিহিত হয়েছিল।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার অন্যতম রহস্যময় ও শক্তিশালী শিক্ষা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, পরম সত্য বা ব্রহ্মকে ডাকার জন্য এই তিনটি পবিত্র শব্দ ব্যবহৃত হয়। 'ওঁ' হলো পরমাত্মার প্রতীকী ধ্বনি, যা আদি ও অন্তহীন। 'তৎ' মানে 'সেই', যা নির্দেশ করে যে সব কিছুর উৎস এবং লক্ষ্য সেই অজানিত পরমেশ্বর। 'সৎ' মানে যা 'চিরন্তন সত্য' এবং যা পবিত্র।

সৃষ্টির শুরুতে যখন কিছুই ছিল না, তখন এই ব্রহ্মাক্ষর দ্বারাই মহাজাগতিক জ্ঞানের উৎস 'বেদ' এবং সেবার পথ 'যজ্ঞ' নির্ধারিত হয়েছিল। এই নামগুলো কেবল কতগুলো অক্ষর নয়, বরং এগুলো হলো আধ্যাত্মিক শক্তির ভাণ্ডার। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, আমরা যখন কোনো শুভ কাজ করি, তখন যদি আমরা এই পবিত্র নামের আশ্রয় নিই, তবে সেই কর্মটি দোষমুক্ত হয় এবং তা সরাসরি ব্রহ্মের চরণে অর্পিত হয়।

মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিটি কাজে কিছু না কিছু ত্রুটি বা অহংকার মিশে থাকে। এই 'ওঁ তৎ সৎ' মন্ত্রটি হলো সেই অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করার মাধ্যম। ব্রাহ্মণ অর্থাৎ যারা ব্রহ্মকে জানেন, তারা সবসময় এই নির্দেশকে স্মরণে রাখেন। এই শব্দত্রয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যাই করি না কেন—পড়াশোনা, যজ্ঞ বা সেবা—সবই সেই এক পরম সত্তার অংশ। এটি আমাদের ব্যক্তিগত অহংকে সরিয়ে বিশ্বজনীন চেতনার সাথে যুক্ত করে। এই আধ্যাত্মিক সংকেতটি আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজকে একটি পবিত্র প্রার্থনা হিসেবে দেখার সুযোগ করে দেয়।
তাত্ত্বিক গভীরতা: ওঁ-তৎ-সৎ হলো আধ্যাত্মিকতার মূলমন্ত্র। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে জগতের সব কিছুই ঈশ্বর থেকে উৎপন্ন এবং ঈশ্বরের দিকেই ধাবমান। নামের মাহাত্ম্যই কর্মের পবিত্রতা রক্ষা করে।