॥ অধ্যায় ১৭, শ্লোক ১ ॥

অর্জুন উবাচ ।
যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ ॥ ১ ॥

সরল ভাবার্থ

অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন—হে কৃষ্ণ! যারা শাস্ত্রীয় বিধি পরিত্যাগ করে কিন্তু শ্রদ্ধার সাথে পূজা বা যজ্ঞ করে, তাদের সেই নিষ্ঠা কোন প্রকৃতির? তা কি সাত্ত্বিক, রাজসিক নাকি তামসিক?

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

অর্জুনের এই প্রশ্নটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। আগের অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে ভগবান বলেছিলেন যে শাস্ত্রীয় বিধি মেনে চলা জরুরি। কিন্তু অর্জুন এখানে জানতে চাচ্ছেন সেইসব মানুষের কথা, যারা হয়তো শাস্ত্রের জটিল নিয়মকানুন জানে না বা পড়ার সুযোগ পায়নি, কিন্তু তাদের মনে গভীর ভক্তি বা 'শ্রদ্ধা' আছে। তারা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী পূজা-অর্চনা বা ভালো কাজ করে। অর্জুনের দ্বিধা হলো—এই ধরনের মানুষের কাজগুলো কি শুভ (সাত্ত্বিক) হিসেবে গণ্য হবে, নাকি সেগুলো কেবল আবেগ বা অজ্ঞতার (রাজসিক/তামসিক) বহিঃপ্রকাশ?

এই শ্লোকটি আমাদের মনের এক চিরন্তন প্রশ্নের প্রতিফলন ঘটায়: ধর্মের ক্ষেত্রে 'ভক্তি' বড় নাকি 'নিয়ম' বড়? অনেক সময় দেখা যায় সাধারণ মানুষ কোনো মন্ত্র না জেনেই অত্যন্ত পবিত্র মনে পুজো করছে—তাদের এই শ্রদ্ধাকে ভগবান কীভাবে দেখেন? অর্জুন এখানে তিনটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন—সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ। তিনি বুঝতে চাইছেন যে শাস্ত্রীয় জ্ঞানহীন কিন্তু শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তির অবস্থান ঠিক কোথায়। এটি কেবল অর্জুনের কৌতূহল নয়, বরং এটি হলো বিশ্বাসের গভীরতা মাপার একটি চাবিকাঠি। শ্রীকৃষ্ণ এর উত্তর দিতে গিয়ে মানুষের হৃদয়ের গহীনে থাকা সেই বিশ্বাসের বা শ্রদ্ধার যে বৈচিত্র্য, তা পরবর্তী শ্লোকগুলোতে উন্মোচন করবেন। এই প্রশ্নটিই ১৭ নম্বর অধ্যায়ের ভিত্তিস্থাপন করে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: জ্ঞান ছাড়া ভক্তি কি সম্ভব? নাকি কেবল ভক্তিই একজন মানুষকে পরম লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে? অর্জুনের এই প্রশ্নটি আমাদের চেতনার স্বরূপ চেনার একটি প্রথম পদক্ষেপ।