॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ২৪ ॥

যত্তু কামেপ্সুনা কর্ম সাহংকারেণ বা পুনঃ ।
ক্রিয়তে বহুলায়াসং তদ্রাজসমুদাহৃতম্ ॥ ২৪ ॥

সরল ভাবার্থ

যে কর্ম অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য এবং যা ফল লাভের ইচ্ছায় অথবা অহংকারের সাথে সম্পন্ন করা হয়, তাকে 'রাজসিক কর্ম' বলা হয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

রাজসিক কর্ম হলো তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং প্রদর্শনের খেলা। এখানে ব্যক্তির প্রধান উদ্দেশ্য থাকে ফলের মোহ (কামেপ্সুনা)। সে যা কিছু করে, তার মূলে থাকে আমি কী পাব? এই চিন্তা। এর সাথে যুক্ত হয় অহংকার (সাহংকারেণ)—অর্থাৎ সে চায় জগত জানুক যে সেই এই বিশাল কাজটি করেছে। রাজসিক কর্মে প্রচুর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম হয় (বহুলায়াসং), কিন্তু সেই পরিশ্রম আনন্দের জন্য নয়, বরং প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য।

এই ধরণের কর্ম মানুষকে অস্থির করে তোলে। কারণ এখানে ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে সারাক্ষণ টেনশন এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। রাজসিক ব্যক্তি অনেক কিছু অর্জন করতে পারে—টাকা, খ্যাতি, পদমর্যাদা—কিন্তু তার মন কখনও শান্ত হয় না। সে আরও বেশি পাওয়ার নেশায় মত্ত থাকে। রাজসিক কর্মের আরেকটি দিক হলো এটি মানুষকে অতি আত্মবিশ্বাসী বা অতি বিষণ্ণ করে তোলে। সাফল্য এলে সে দেমাক করে, আর ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়ে।

বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা যা কিছু করি, তার অধিকাংশই রাজসিক। আমরা কেবল সফল হওয়ার জন্য কাজ করি, কিন্তু কাজের পেছনের নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিকতা ভুলে যাই। শ্রীকৃষ্ণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, কেবল কঠোর পরিশ্রম করলেই কর্ম শ্রেষ্ঠ হয় না; সেই পরিশ্রমের পেছনের উদ্দেশ্য যদি অশুদ্ধ হয়, তবে তা কেবল যন্ত্রণাই বাড়ায়। রাজসিক কর্ম মানুষকে সংসারের চক্রে আবদ্ধ রাখে।
তাত্ত্বিক গভীরতা: অহংকার মিশ্রিত কর্ম আত্মাকে ক্লান্ত করে। রাজসিক ব্যক্তি কর্মের মালিক হতে চায়, কিন্তু সে আসলে কর্মের গোলাম হয়ে পড়ে। শান্তির জন্য রাজসিকতা ত্যাগ করে সাত্ত্বিকতার দিকে যেতে হবে।