॥ অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৫৭ ॥

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ ।
বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব ॥ ৫৭ ॥

সরল ভাবার্থ

চিত্তের দ্বারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করে, আমাকেই পরম লক্ষ্য জ্ঞান করে এবং বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে সর্বদা আমাতে নিবিষ্টচিত্ত হও।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণ এখানে অর্জুনকে অর্পণ বা সমর্পণের পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন না যে কাজ ছেড়ে দাও, তিনি বলছেন—'চেতসা' বা মনের দ্বারা সমস্ত কর্ম আমাতে ত্যাগ করো। এর মানে হলো কর্মের ফলাফলের চিন্তা ও কর্তৃত্বের ভাব ঈশ্বরকে দিয়ে দেওয়া। যখন আমরা কোনো কাজ শুরু করি, তখন যদি আমাদের উদ্দেশ্য থাকে কেবল ভগবানের প্রীতিসাধন, তবে সেই কাজ আর সাধারণ কাজ থাকে না।

'মৎপরঃ' হওয়ার অর্থ হলো জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে ভগবানকে স্থির করা। আমাদের বুদ্ধি যেন সবসময় এই সত্যটি মনে রাখে যে—সবই তাঁর এবং তিনি যা করেন তা মঙ্গলের জন্য। একেই বলা হয়েছে 'বুদ্ধিযোগ'। বুদ্ধি যখন জাগতিক বস্তু থেকে সরে গিয়ে পরমাত্মার সাথে যুক্ত হয়, তখনই মানুষ স্থিরতা পায়।

ভগবানের শেষ নির্দেশ হলো 'মচ্চিত্তঃ সততং ভব'—অর্থাৎ প্রতিটি মুহূর্তে আমাকে মনে রাখো। রান্না করা, যুদ্ধ করা বা পড়াশোনা করা—সবকিছুর মাঝখানে যেন মনের একটি সূক্ষ্ম টান ভগবানের দিকে থাকে। যেমন একজন নর্তকী নাচ করার সময় তাঁর সব মনোযোগ তাঁর পায়ের তাল ও তালের দিকে রাখে, তেমনি একজন ভক্ত তাঁর কাজ করার সময় তাঁর অন্তরকে শ্রীকৃষ্ণের চরণে সঁপে দেন। এটিই হলো নিরন্তর যোগের অবস্থা। এর মাধ্যমে জীবনের সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, কারণ আমরা তখন জানি যে আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য স্বয়ং ঈশ্বর রয়েছেন।
তাত্ত্বিক গভীরতা: সমর্পণ হলো আধ্যাত্মিকতার প্রাণ। বুদ্ধি যখন ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়, তখন জীবনের জটিলতাগুলো সহজ হয়ে যায়। সর্বদা ভগবানের চিন্তাই হলো শ্রেষ্ঠ জপ।