সরল ভাবার্থ
হে কৌন্তেয়! মোহবশত তুমি এখন যে কাজ করতে চাইছ না, তোমার স্বভাবজাত কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে তুমি অবশ হয়েও সেই কাজই করবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
পূর্ববর্তী শ্লোকের ধারায় শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'মোহ' এর চূড়ান্ত প্রভাব বর্ণনা করেছেন। মোহ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে দিয়ে এমন ভাবায় যা বাস্তবে অসম্ভব। অর্জুন যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে ভেবেছিলেন তিনি শান্তিতে সন্ন্যাসী হয়ে জীবন কাটাবেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে তাঁর শরীর ও মনে ক্ষত্রিয়ের তেজ বিদ্যমান।
'অবশোঽপি'—এই শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো—নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও। অর্থাৎ মানুষ যখন তাঁর স্বভাবের টানে কোনো কাজ করে, তখন সে আসলে নিজের প্রবৃত্তির হাতে বন্দি থাকে। আমাদের পূর্বজন্মের সংস্কার এবং এই জন্মের গুণের প্রভাবে আমরা এমনভাবে তৈরি হই যে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমরা নির্দিষ্ট কর্ম করতে বাধ্য হই।
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে, তুমি যদি এখন পালিয়েও যাও, তোমার ভেতরের তেজ তোমাকে স্থির থাকতে দেবে না। তুমি অবশ হয়ে ফিরে আসবে ন্যায়ের লড়াইয়ে। তবে পার্থক্যটা হবে—এখন করলে তুমি ধর্মের জন্য করবে, আর পরে করলে তুমি নিজের স্বভাবের তাড়নায় করবে। প্রথমটি তোমাকে মুক্তি দেবে, দ্বিতীয়টি তোমাকে কর্মফলে জড়াবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো নিজের অবশ হওয়াকে ভগবানের চরণে সমর্পণ করা এবং তাঁর আদেশে কর্ম করা। মায়া বা মোহের বশে আমরা আমাদের গন্তব্য পরিবর্তন করতে পারি না, কেবল আমাদের যাত্রাপথকে যন্ত্রণাদায়ক করে তুলি। সত্যকে মেনে নেওয়াই হলো বীরত্ব।
তাত্ত্বিক গভীরতা: মানুষ তাঁর স্বভাবের জালে আবদ্ধ। এই জাল থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো কর্মের কর্তৃত্ব ত্যাগ করে তা পরমেশ্বরকে সমর্পণ করা। মোহ কেবল অশান্তি বাড়ায়, সত্যকে বদলাতে পারে না।