সরল ভাবার্থ
যদি কেউ কর্মকে দুঃখদায়ক মনে করে শারীরিক কষ্টের ভয়ে তা পরিত্যাগ করে, তবে সেই ত্যাগ হলো 'রাজসিক ত্যাগ'। এমন ত্যাগের ফলে ত্যাগের কোনো ফল লাভ হয় না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
রাজসিক ত্যাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'কষ্টের ভয়'। এখানে ব্যক্তি ত্যাগের মহিমা বুঝে কাজ ছাড়ে না, বরং সে কাজ ছাড়ে কারণ সেই কাজ করতে গেলে শরীরের ওপর ধকল যাবে বা তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। 'কায়ক্লেশভয়াৎ'—অর্থাৎ শারীরিক যন্ত্রণার ভয়ে যারা আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে কর্ম থেকে বিরত থাকে, তারা রাজসিক।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি হয়তো সাধনা করতে চায়, কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয় বলে সে সাধনা ছেড়ে দিল। অথবা কেউ একজন দরিদ্র সেবা করতে চায়, কিন্তু রোদে ঘুরতে কষ্ট হবে ভেবে সে পিছিয়ে এল। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এমন ত্যাগের কোনো মূল্য নেই। রাজসিক ব্যক্তি কেবল নিজের সুখ এবং আরামের দিকে নজর দেয়। সে ত্যাগের পোশাক পরতে পারে, কিন্তু তার ভেতরে ভোগের আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান থাকে।
ভগবান এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন—'নৈব ত্যাগফলং লভেৎ'। অর্থাৎ রাজসিক ত্যাগী ব্যক্তি ত্যাগের মাধ্যমে যে মনের শান্তি বা আধ্যাত্মিক উন্নতি হওয়ার কথা, তা কখনও পায় না। কারণ তার ত্যাগের মূলে রয়েছে স্বার্থপরতা ও ভীরুতা। জীবন মানেই সংগ্রাম, আর কর্তব্য পালন করতে গেলে কিছু শারীরিক বা মানসিক কষ্ট হবেই। সেই কষ্টকে মেনে নিয়ে এগিয়ে চলাই হলো বীরের ধর্ম। কষ্টের ভয়ে দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কেবল ত্যাগের অভিনয় মাত্র। এটি মানুষকে কেবল মায়ার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ায়, মুক্তির আস্বাদ দেয় না। রাজসিক ত্যাগ আসলে এক প্রকার পলায়নীবৃত্তি।
তাত্ত্বিক গভীরতা: আরামপ্রিয় মন কখনও পরমাত্মার সন্ধান পায় না। কর্মের কষ্টকে সহ্য করার শক্তিই ত্যাগের প্রথম পদক্ষেপ। যা কেবল সুবিধার জন্য করা হয়, তা আধ্যাত্মিকতা নয়।