॥ অধ্যায় ৪, শ্লোক ২ ॥

এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ॥ ৪.২ ॥

সরল ভাবার্থ

হে পরন্তপ (শত্রুবিজয়ী)! এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রাপ্ত এই পরম জ্ঞান রাজর্ষিরা জানতেন। কিন্তু দীর্ঘ কাল অতিবাহিত হওয়ার ফলে সেই যোগতত্ত্ব এই পৃথিবীতে বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এখানে শ্রীকৃষ্ণ বর্ণনা করছেন কীভাবে একটি মহান জ্ঞান হারিয়ে যায়। তিনি বলছেন যে আদি রাজর্ষিরা এই তত্ত্ব জানতেন এবং তাঁরা রাজ্য শাসন করার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনাও করতেন। কিন্তু কালের প্রবাহে মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা, ভোগবিলাস এবং অহংকার বেড়ে যাওয়ার ফলে সেই পবিত্র জ্ঞানটির অপব্যাখ্যা হয় বা তা অবলুপ্ত হয়।

এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সতর্কতা। যখন মানুষ ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে বেশি মত্ত হয় এবং কর্মযোগের ভেতরের নির্যাস (নিষ্কাম কর্ম) ভুলে যায়, তখনই 'যোগ নষ্ট' হয়। নষ্ট হওয়ার অর্থ এই নয় যে জ্ঞানটি শেষ হয়ে গেছে, বরং এর অর্থ হলো সাধারণ মানুষ আর সেই জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছে না। কৃষ্ণ অর্জুনকে 'পরন্তপ' বলছেন—যিনি শত্রুকে দহন করেন। এটি একটি ইঙ্গিত যে অর্জুনকে এখন নিজের ভেতরের মোহকে দহন করে সেই বিলুপ্ত জ্ঞান আবার গ্রহণ করতে হবে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি ধর্মের গ্লানি বা অবক্ষয়ের কারণ দেখায়। যখন গুরু ও শিষ্য উভয়েই অযোগ্য হয়ে পড়ে, তখন পরম সত্য ম্লান হয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিজের অবতার হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করছেন। তিনি বলছেন যে, যেহেতু পৃথিবী থেকে এই শ্রেষ্ঠ জ্ঞানটি হারিয়ে গেছে, তাই একে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব স্বয়ং ঈশ্বরের। আমাদের জীবনেও যদি আমরা দেখি যে আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছি, তবে বুঝতে হবে আমাদের ভেতরের সেই আধ্যাত্মিক পরম্পরাটি বা যোগসূত্রটি ছিঁড়ে গেছে। একে আবার জোড়া লাগানোর জন্যই গীতার শরণাপন্ন হতে হয়।