॥ শ্লোক ৪.১ ॥
শ্রীভগবানুবাচ—
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবান্ অহম্ অব্যয়ম্ ।
বিবস্বান্ মনবে প্রাহ মনুর ইক্ষ্বাকবেঽব্রবীৎ ॥
অনুবাদ: শ্রীভগবান্ কহিলেন: আমি এই অব্যয় (নিত্য) যোগ প্রথমে সূর্যদেব বিবস্বানকে বলিয়াছিলাম; বিবস্বান মনুকে বলিয়াছিলেন এবং মনু তাহা ইক্ষ্বাকুকে বলিয়াছিলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২ ॥
এবং পরম্পরা-প্রাপ্তম্ ইমম্ রাজর্ষয়ো বিদুঃ ।
স কালেেন্ ইহ মহতাা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ ॥
অনুবাদ: হে পরন্তপ (অর্জুন), এইভাবে পরম্পরাক্রমে প্রাপ্ত এই যোগকে রাজর্ষিগণ জানিতেন। কিন্তু দীর্ঘকাল পরে এই যোগ পৃথিবীতে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩ ॥
স স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাাতনঃ ।
ভক্তোঽসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্ ॥
অনুবাদ: তুমি আমার ভক্ত ও সখা, সেই কারণেই আজ আমি তোমাকে সেই পুরাতন যোগ (জ্ঞান) বলিলাম। কারণ ইহাই অতি উত্তম রহস্য।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৪ ॥
অর্জুন উবাচ—
অপরং ভবতোে জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ ।
কথমেতদ্ বিজ্ঞানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি ॥
অনুবাদ: অর্জুন কহিলেন: আপনার জন্ম তো এই (নিকট) কালের, আর বিবস্বানের জন্ম বহু পূর্বে। আপনি যে সৃষ্টির আদিতে এই জ্ঞান বলিয়াছিলেন, তাহা আমি কী প্রকারে বুঝিব?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৫ ॥
শ্রীভগবানুবাচ—
বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন।
তান্য অহং বেদ সর্বাাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ॥
অনুবাদ: শ্রীভগবান্ কহিলেন: হে অর্জুন, আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হইয়াছে। হে পরন্তপ, আমি সেই সবগুলিই জানি, কিন্তু তুমি জান না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৬ ॥
অজেহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানীমীম্বরোহপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ॥
অনুবাদ: আমি জন্মহীন, অব্যয়স্বভাব এবং সর্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও নিজের প্রকৃতিকে আশ্রয় করিয়া নিজ মায়া (যোগমায়া) দ্বারা আবির্ভূত হই।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৭ ॥
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহ্যম্ ॥
অনুবাদ: হে ভারত, যখনই ধর্মের গ্লানি (অবক্ষয়) হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে, তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি (আবির্ভূত) করি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৮ ॥
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥
অনুবাদ: সাধুদের পরিত্রাণ করিবার জন্য, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করিবার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপন করিবার জন্য আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৯ ॥
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।
অনুবাদ: হে অর্জুন, যিনি আমার এই জন্ম ও কর্মকে দিব্য (অলৌকিক) বলিয়া যথার্থরূপে জানেন, তিনি দেহত্যাগ করিয়া আর জন্ম গ্রহণ করেন না, তিনি আমাকেই লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১০ ॥
বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ।
বহুবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতাঃ।।
অনুবাদ: আসক্তি, ভয় ও ক্রোধমুক্ত, আমাতে মগ্ন এবং আমাকে আশ্রয়কারী বহু ব্যক্তি জ্ঞানরূপ তপস্যা দ্বারা পবিত্র হইয়া আমার ভাব (স্বরূপ) লাভ করিয়াছেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১১ ॥
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ ॥
অনুবাদ: যারা যেভাবেই আমার কাছে আসে, আমি তাদের সেভাবেই গ্রহণ করি। হে পার্থ, সকল মানুষ সব দিক থেকে আমার পথই অনুসরণ করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১২ ॥
কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং য়জন্ত ইহ দেবতাঃ ।
ক্ষিপ্রং হি মানুষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা ॥
অনুবাদ: এই মনুষ্যলোকে যারা কর্মের ফলসিদ্ধি কামনা করে, তারা দেব-দেবীর পূজা করে; কারণ কর্ম থেকে উৎপন্ন সিদ্ধি এই পৃথিবীতে দ্রুত লাভ হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৩ ॥
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্ ॥
অনুবাদ: সৃষ্টিতে গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে চারটি বর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) আমার দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেই সৃষ্টির কর্তা হয়েও আমাকে তুমি অকর্তা ও অব্যয় বলে জানবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৪ ॥
ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা ।
ইতি মাং যোহভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে ॥
অনুবাদ: কর্মসমূহ আমাকে লিপ্ত করে না এবং কর্মফলে আমার কোনো স্পৃহা নেই। যিনি আমাকে এইভাবে জানেন, তিনিও কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৫ ॥
এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ ।
কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্ ॥
অনুবাদ: পূর্বে মোক্ষ-ইচ্ছুকরাও এই জ্ঞান লাভ করে কর্ম করেছিলেন। অতএব, তুমিও পূর্বতনদের দ্বারা পূর্বকালে কৃত কর্মই করো।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৬ ॥
কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োঽপ্যত্র মো হিতাঃ ।
তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজজ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ ॥
অনুবাদ: কর্ম কী এবং অকর্ম কী, এই বিষয়ে জ্ঞানীরাও মোহগ্রস্ত হন। আমি তোমাকে সেই কর্মের কথা বলব, যা জানলে তুমি অশুভ (সংসার-বন্ধন) থেকে মুক্ত হবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৭ ॥
কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যংচ বিকর্মণঃ ।
অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনাা কর্মণো গতিঃ ॥
অনুবাদ: কর্মের তত্ত্ব জানা প্রয়োজন, বিকর্মের (নিষিদ্ধ কর্ম) তত্ত্বও জানা প্রয়োজন এবং অকর্মের (কর্ম না করার) তত্ত্বও জানা প্রয়োজন; কারণ কর্মের গতি অত্যন্ত গভীর।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৮ ॥
কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম য়ঃ ।
স বুদ্ধিমান্ মনুষ্যে ষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ ॥
অনুবাদ: যিনি কর্মের মধ্যে অকর্ম এবং অকর্মের মধ্যে কর্ম দেখেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান; তিনিই যোগী এবং তিনি সমস্ত কর্মের সম্পাদনকারী।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.১৯ ॥
যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণং তমাহুঃ পণ্ডিতং বুধাঃ ॥
অনুবাদ: যার সমস্ত প্রচেষ্টা কামনা ও সঙ্কল্প বর্জিত, এবং যার কর্মসমূহ জ্ঞানরূপ অগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে, জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাকেই পণ্ডিত বলেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২০ ॥
ত্যক্তা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ ।
কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ ॥
অনুবাদ: যিনি কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত ও আশ্রয়রহিত হন, তিনি কর্মে প্রবৃত্ত হয়েও প্রকৃতপক্ষে কিছুই করেন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২১ ॥
নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ ।
শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্॥
অনুবাদ: যিনি আশাহীন, যার মন ও বুদ্ধি বশীভূত এবং যিনি সকল প্রকার পরিগ্রহ (সংগ্রহ) ত্যাগ করেছেন, তিনি কেবল শরীর-রক্ষার জন্য কর্ম করেও পাপগ্রস্ত হন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২২ ॥
যদৃচ্ছা-লাভ-সন্তুষ্টো দ্বন্দ্বাতীতো বিমৎসরঃ ।
সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাঽপি ন নিবধ্যতে ॥
অনুবাদ: যিনি স্বেচ্ছায় (চেষ্টা ছাড়াই) যা লাভ হয় তাতেই সন্তুষ্ট, দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত, মাৎসর্যহীন এবং সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে সমভাবাপন্ন, তিনি কর্ম করেও বন্ধনে আবদ্ধ হন না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৩ ॥
গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ ।
যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে ॥
অনুবাদ: আসক্তি বর্জিত, মুক্ত এবং জ্ঞানে অবস্থিতচিত্ত ব্যক্তি যখন যজ্ঞের (ভগবানের প্রীতির) জন্য কর্ম করেন, তখন তাঁর সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণরূপে লয়প্রাপ্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৪ ॥
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্ ।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা ॥
অনুবাদ: অর্পণকারী ব্রহ্ম, হব্যও ব্রহ্ম, ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে ব্রহ্মরূপ কর্তার দ্বারা আহুতি দেওয়া হয়; ব্রহ্মকর্মরূপ সমাধির দ্বারা তাঁকেই (ব্রহ্মকেই) লাভ করা যায়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৫ ॥
দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে ।
ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈব জুহ্বতি ॥
অনুবাদ: কোনো কোনো যোগী দৈবযজ্ঞের (দেবতাদের পূজার) উপাসনা করেন; আবার অন্য যোগীরা ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে যজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞেরই আহুতি দেন (আত্মজ্ঞান লাভের জন্য)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৬ ॥
শ্রোত্রাদীনি ইন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহ্বতি ।
শব্দাদীন্ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহ্বতি ॥
অনুবাদ: কেউ কেউ সংযমরূপ অগ্নিতে শ্রবণাদি ইন্দ্রিয়সমূহ আহুতি দেন, আবার কেউ কেউ ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে শব্দাদি বিষয়সমূহ আহুতি দেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৭ ॥
সর্বাণীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রাণকর্মাণি চাপরে ।
আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহ্বতি জ্ঞানদীপিতে ॥
অনুবাদ: আবার অন্য কেউ কেউ আত্মসংযমরূপ যোগাগ্নিতে, যা জ্ঞান দ্বারা প্রদীপ্ত, সেখানে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কর্ম এবং প্রাণশক্তির কর্মসমূহকে আহুতি দেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৮ ॥
দ্রব্যায়জ্ঞা স্তপোয়জ্ঞা যোগয়জ্ঞা স্তথাঽপরে ।
স্বাধ্যায়জ্ঞানয়জ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ ॥
অনুবাদ: অনেকে দ্রব্যরূপ যজ্ঞকারী, অনেকে তপরূপ যজ্ঞকারী, অন্যেরা যোগরূপ যজ্ঞকারী, আবার কেউ কেউ স্বাধ্যায় (শাস্ত্র পাঠ) ও জ্ঞানরূপ যজ্ঞকারী এবং এঁরা সকলেই কঠোর ব্রতধারী যত্নশীল।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.২৯ ॥
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে ।
প্রাণাপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ ॥
অনুবাদ: অনেকে অপান বায়ুতে প্রাণবায়ুকে এবং প্রাণবায়ুতে অপান বায়ুকে আহুতি দেন; আবার অনেকে প্রাণ ও অপান বায়ুর গতি রোধ করে প্রাণায়ণে রত থাকেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩০ ॥
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেযু জুহ্বতি ।
সর্বেঽপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্মষাঃ ॥
অনুবাদ: অন্যেরা আবার নিয়মিত আহারের দ্বারা প্রাণশক্তিকে প্রাণশক্তিতেই আহুতি দেন। এঁরা সকলেই যজ্ঞের তত্ত্ববিদ এবং যজ্ঞের দ্বারা এদের পাপসমূহ নাশ হয়েছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩১ ॥
যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্ ।
নাহয়ং লোকোঽস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোঽন্যঃ কুরুসত্তম ॥
অনুবাদ: যাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত ভোজন করেন, তাঁরা সনাতন ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, যজ্ঞহীন ব্যক্তির এই লোকও সুখকর নয়, তবে অন্য লোক (পরলোক) কি করে সম্ভব?
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩২ ॥
এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে ।
কর্মজান্ বিদ্ধি তান্ সর্বান্ এবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে ॥
অনুবাদ: এইভাবে বহু প্রকার যজ্ঞ ব্রহ্মার মুখে (বেদে) বিস্তারিত হয়েছে। তুমি এই সব যজ্ঞকে কর্ম থেকে উদ্ভূত বলে জানবে; এই প্রকার জানলে তুমি মুক্ত হবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৩ ॥
শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্যজ্ঞাদ্ জ্ঞানয়জ্ঞঃ পরন্তপ ।
সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে ॥
অনুবাদ: হে পরন্তপ, দ্রব্যময় যজ্ঞের চেয়ে জ্ঞান-যজ্ঞ শ্রেষ্ঠ। হে পার্থ, সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানে সমাপ্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৪ ॥
তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া ।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্ তত্ত্বদর্শিনঃ ॥
অনুবাদ: তুমি প্রণাম, প্রশ্ন এবং সেবার মাধ্যমে সেই জ্ঞান লাভ করো। তত্ত্বদর্শী জ্ঞানীরা তোমাকে সেই জ্ঞান উপদেশ করবেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৫ ॥
যজজ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পান্ডব।
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি।।
অনুবাদ: হে পাণ্ডব, যে জ্ঞান লাভ করলে তুমি আর এমনভাবে মোহে আচ্ছন্ন হবে না, এবং যে জ্ঞানের প্রভাবে তুমি সকল প্রাণীকে সম্পূর্ণরূপে আমাতে ও নিজের মধ্যে দেখতে পাবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৬ ॥
অপচেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ ।
সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি ॥
অনুবাদ: তুমি যদি সকল পাপীর চেয়েও মহাপাপী হও, তবুও জ্ঞানরূপ ভেলা বা নৌকার সাহায্যে তুমি সমস্ত পাপ সমুদ্র পার হতে পারবে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৭ ॥
যথৈধাংসি সমিদ্বোহগ্নির্ভস্মাৎ কুরুতেহর্জুন।
জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা
অনুবাদ: হে অর্জুন, যেমন প্রদীপ্ত অগ্নি ইন্ধনকে (কাঠকে) ভস্মীভূত করে দেয়, তেমনই জ্ঞানরূপ অগ্নি সমস্ত কর্মকে ভস্মীভূত করে দেয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৮ ॥
ন হি জ্ঞা নেন সদৃশং পবিত্রম্ ইহ বিদ্যতে ।
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি ॥
অনুবাদ: এই জগতে জ্ঞানের সমান পবিত্র আর কিছুই নেই। যে যোগী কর্মযোগে সিদ্ধিলাভ করেছেন, তিনি কালক্রমে (যথাসময়ে) নিজেই সেই জ্ঞান নিজের মধ্যে লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৩৯ ॥
শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তত্পরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ ।
জ্ঞানং লব্দ্ধা পরাং শান্তিম্ অচিরেণাধিচ্ছতি ॥
অনুবাদ: শ্রদ্ধাবান, যত্নশীল এবং সংযত-ইন্দ্রিয় ব্যক্তি জ্ঞান লাভ করেন। জ্ঞান লাভ করার পর তিনি অচিরে পরম শান্তি প্রাপ্ত হন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৪০ ॥
অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি ।
নাহয়ং লোকোঽস্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ ॥
অনুবাদ: অজ্ঞ, শ্রদ্ধাহীন এবং সংশয়াপন্ন ব্যক্তি বিনাশ প্রাপ্ত হয়। সংশয়যুক্ত ব্যক্তির এই লোকও (পৃথিবী) নেই, পরলোকও নেই, এবং সুখও নেই।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৪১ ॥
যোগসংন্যস্তকর্মাণং জ্ঞানচ্ছিন্নদ্বৈধম্ আত্মনঃ ।
বশমাত্ত্বন্তং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয় ॥
অনুবাদ: হে ধনঞ্জয়, যিনি যোগের দ্বারা কর্মফল ত্যাগ করেছেন এবং জ্ঞান দ্বারা নিজের সন্দেহ দূর করেছেন, সেই আত্মজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে কোনো কর্মই আর বন্ধন করতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৪.৪২ ॥
তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃত্স্থং জ্ঞানাসিনাঽত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈতং সংশয়ং যোগম্ আতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত ॥
অনুবাদ: অতএব, তুমি নিজের হৃদয়ে অবস্থিত অজ্ঞানজনিত এই সংশয়কে জ্ঞানরূপ খড়্গ দ্বারা ছেদন করো এবং যোগ অবলম্বন করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও, হে ভারত।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগো নাম চতুর্থোঽধ্যায়ঃ ॥
এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা উপনিষদের ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সংবাদে 'জ্ঞান-কর্ম-সন্ন্যাস যোগ' নামক চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত হলো।