॥ অধ্যায় ৪, শ্লোক ৪২ ॥

তস্মাদজ্ঞানসম্ভূতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ ।
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত ॥ ৪.৪২ ॥

সরল ভাবার্থ

অতএব হে ভারত! তোমার হৃদয়ে স্থিত অজ্ঞানজনিত এই সংশয়কে জ্ঞানরূপ তলোয়ার দিয়ে ছিন্ন করো এবং নিষ্কাম কর্মযোগ আশ্রয় করে যুদ্ধের জন্য উঠে দাঁড়াও।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি চতুর্থ অধ্যায়ের সমাপনী শ্লোক এবং অর্জুনের প্রতি কৃষ্ণের এক জোরালো আহ্বান। এটি কেবল অর্জুনের জন্য নয়, আমাদের সবার জীবনের জন্য এক চূড়ান্ত আদেশ।

১. হৃৎস্থং অজ্ঞানসম্ভূতং: কৃষ্ণ বলছেন যে সংশয় বা সন্দেহ বাইরে থেকে আসে না, এটি আমাদের হৃদয়ের ভেতরেই অজ্ঞানতা থেকে জন্ম নেয়। অজ্ঞানতা হলো অন্ধকার, আর সংশয় হলো সেই অন্ধকারের সৃষ্টি করা ছায়া।

২. জ্ঞানাসিনা (জ্ঞানের তলোয়ার): এখানে জ্ঞানকে একটি তীক্ষ্ণ তলোয়ারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তলোয়ার যেমন এক কোপে বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে, জ্ঞানও তেমনি সমস্ত দ্বিধাকে এক নিমেষে নির্মূল করতে পারে। কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই তলোয়ার চালানোর নির্দেশ দিচ্ছেন।

৩. উত্তিষ্ঠ (উঠে দাঁড়াও): এটি গীতার অন্যতম মূল বাণী। আধ্যাত্মিকতা মানে অলসতা নয়, বরং পূর্ণ শক্তিতে জেগে ওঠা। শোক এবং মোহ মানুষকে বসিয়ে দেয়, আর জ্ঞান মানুষকে সক্রিয় করে তোলে।

৪. ভারত: অর্জুনকে তাঁর মহান পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়ে দিয়ে 'ভারত' বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব ও বীরত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ধর্মীয় বিচারে, এই অধ্যায়ের সমাপ্তি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে মানুষের জীবনের প্রধান সমস্যা হলো অজ্ঞানতা, আর সমাধান হলো জ্ঞান। আমরা যদি ভয় ও সন্দেহ ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে কাজ করতে পারি, তবেই আমরা ভগবানের প্রিয় হতে পারব। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে পালানো নয়, বরং জীবনযুদ্ধে বীরের মতো জয়ী হওয়াই হলো প্রকৃত ধর্ম। এটি আমাদের কাপুরুষতা বিসর্জন দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস যোগায়।