॥ অধ্যায় ৪, শ্লোক ৩১ ॥

যজ্ঞশিষ্টা মৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্ ।
নায়ং লোকোঽস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোঽন্যঃ কুরুসত্তম ॥ ৪.৩১ ॥

সরল ভাবার্থ

হে কুরুসত্তম! যাঁরা যজ্ঞের অবশিষ্টাংশরূপ অমৃত আস্বাদন করেন, তাঁরা সনাতন ব্রহ্ম লাভ করেন। কিন্তু যিনি যজ্ঞ করেন না, তাঁর জন্য এই ইহলোকও সুখকর নয়, পরলোক তো দূরের কথা।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এই শ্লোকটি জীবনের এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:

১. যজ্ঞশিষ্ট অমৃত: যজ্ঞ শেষে যে অংশটুকু অবশিষ্ট থাকে, তাকে 'প্রসাদ' বা 'অমৃত' বলা হয়। যখন আমরা প্রথমে ঈশ্বরকে উৎসর্গ করি এবং তারপর নিজেরা গ্রহণ করি, তখন সেই অন্ন বা কর্ম পবিত্র হয়। এটি মানুষের লোভ সংবরণ করতে শেখায়। যারা কেবল নিজের ভোগের জন্য সবকিছু জমা করে, তারা অমৃত লাভ করতে পারে না।

২. অযজ্ঞস্য জীবন: শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলছেন যে যারা কোনো যজ্ঞ করে না (অর্থাৎ যারা স্বার্থপর), তাদের জন্য এই পৃথিবীও নরকতুল্য। কেন? কারণ স্বার্থপর মানুষ কোনোদিন সুখী হতে পারে না। সে সবসময় ভয়ে থাকে যে তার ধন কেড়ে নেওয়া হবে, তার মনে শান্তি থাকে না।

৩. ইহলোক ও পরলোক: যদি কোনো মানুষ এই পৃথিবীতে মানুষের সাথে ভালোবাসা, দয়া বা ত্যাগের আচরণ (যা এক প্রকার সামাজিক যজ্ঞ) না করে, তবে সে পৃথিবীতে বন্ধুহীন ও একাকী হয়ে পড়বে। আর মৃত্যুর পর তার গতি আরও খারাপ হবে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের 'সেবার ধর্ম' শেখায়। আমরা এই পৃথিবীতে একা আসিনি এবং একা বাঁচতে পারি না। প্রকৃতি আমাদের যা দেয়, তার কিছু অংশ যদি আমরা ফিরিয়ে না দিই, তবে আমরা চোর হিসেবে গণ্য হই। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, তুমি যুদ্ধের মাধ্যমে ধর্ম সংস্থাপন রূপ যজ্ঞ করো, তবেই তুমি অমরত্ব লাভ করবে। এটি আমাদের শেখায় যে কিছু না দিয়ে কেবল নেওয়ার চেষ্টা করাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।