॥ অধ্যায় ৪, শ্লোক ৩৭ ॥

যথৈধাংসি সমিদ্ধোঽগ্নির্ভস্মসাৎ কুরুতেঽর্জুন ।
জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা ॥ ৪.৩৭ ॥

সরল ভাবার্থ

হে অর্জুন! প্রজ্জ্বলিত অগ্নি যেমন কাষ্ঠসমূহকে ভস্মীভূত করে, তেমনি জ্ঞানরূপ অগ্নি সমস্ত কর্মফলকে ভস্মীভূত করে দেয়।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

আগের শ্লোকে নৌকার উপমা দেওয়ার পর, এখানে শ্রীকৃষ্ণ আগুনের এক প্রখর উপমা ব্যবহার করেছেন। এটি আধ্যাত্মিক শুদ্ধিকরণের এক চূড়ান্ত স্তর।

১. জ্ঞানাগ্নি বা জ্ঞানের আগুন: আগুন যেমন সবকিছুকে পুড়িয়ে খাঁটি করে দেয়, জ্ঞানও তেমন মানুষের চিন্তা ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করে। এখানে 'কাষ্ঠ' বা কাঠ বলতে আমাদের জমে থাকা অসংখ্য কর্মফলকে (সঞ্চিত কর্ম) বোঝানো হয়েছে। আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের যে ভালো-মন্দের হিসাব, তা জ্ঞানের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

২. ভস্মসাৎ করার রহস্য: যখন কাঠ পুড়ে ছাই হয়, তখন তা থেকে আর নতুন করে গাছ জন্মানো সম্ভব নয়। তেমনি যখন জ্ঞানের উদয় হয়, তখন কর্মের বীজ নষ্ট হয়ে যায়। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে সে 'কর্তা' নয়, বরং ঈশ্বরই সব করাচ্ছেন, তখন সেই কাজের আর কোনো ফল তাঁকে স্পর্শ করে না।

৩. সর্বকর্মাণি: এখানে 'সব কর্ম' বলতে তিন প্রকারের কর্মকে বোঝানো হয়েছে—সঞ্চিত (পুরানো), প্রারব্ধ (বর্তমান) এবং আগামী (ভবিষ্যৎ)। জ্ঞান প্রারব্ধ কর্মকে হয়তো সাথে সাথে থামায় না (যেমন পাখা বন্ধ করলেও তা কিছুক্ষণ ঘোরে), কিন্তু এটি নতুন কোনো কর্মবন্ধন তৈরি হতে দেয় না।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের কর্মের দায়মুক্তি দেয়। অর্জুনকে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে যুদ্ধের এই ভয়াবহতা তোমার মনে পাপের বীজ বপন করতে পারবে না যদি তোমার ভেতর জ্ঞানরূপ আগুন জ্বলে ওঠে। আমাদের সাধারণ জীবনেও আমরা যদি এই বোধে কাজ করি যে আমি কেবল আমার দায়িত্ব পালন করছি, তবে কোনো দুশ্চিন্তা আমাদের মনে বাসা বাঁধতে পারে না। জ্ঞানের এই দহন আমাদের আত্মার আসল দীপ্তি প্রকাশ করে।