॥ অধ্যায় ৪, শ্লোক ১৩ ॥

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্ ॥ ৪.১৩ ॥

সরল ভাবার্থ

গুণের তারতম্য এবং কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি চারটি বর্ণের সৃষ্টি করেছি। আমি এর স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অবিনাশী বলে জানবে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা

এটি গীতার অন্যতম বিতর্কিত এবং একই সাথে সবচেয়ে পরিষ্কার শ্লোক। শ্রীকৃষ্ণ এখানে 'বর্ণ' বা সামাজিক শ্রেনীবিন্যাসের প্রকৃত ভিত্তি পরিষ্কার করেছেন। তিনি পরিষ্কার বলেছেন—বর্ণ নির্ধারিত হয় 'গুণ' (মানসিক প্রবৃত্তি) এবং 'কর্ম' (পেশা বা কাজ) দ্বারা; বংশ বা জন্ম দ্বারা নয়।



১. যাদের মধ্যে জ্ঞান ও পবিত্রতার (সত্ত্বগুণ) প্রাধান্য বেশি, তারা ব্রাহ্মণ। ২. যাদের মধ্যে সাহস ও নেতৃত্বের (রজোগুণ) প্রাধান্য বেশি, তারা ক্ষত্রিয়। ৩. যারা ব্যবসা ও উৎপাদনে দক্ষ, তারা বৈশ্য। ৪. যারা সেবামূলক কাজে দক্ষ, তারা শূদ্র। এটি একটি স্বাভাবিক সামাজিক বিভাজন যা ছাড়া কোনো সমাজ চলতে পারে না।

কৃষ্ণ আরও একটি গভীর কথা বলেছেন—তিনি এই ব্যবস্থার স্রষ্টা হয়েও নিজে এর বাইরে। একে বলা হয় 'অকর্তা'। ঈশ্বর জগত সৃষ্টি করেন যেমন সূর্য ফুল ফোটায়। সূর্য নিজে কিন্তু ফুল ফোটার কাজের সাথে লেপটে থাকে না, তার আলোয় ফুল আপনিই ফোটে। ঠিক তেমনি, প্রকৃতির নিয়মে এই সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হয়, কিন্তু ঈশ্বর নির্লিপ্ত থাকেন।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি জন্মগত জাতপাতের কুসংস্কারকে অস্বীকার করে। একজন মুচির সন্তান যদি বীর ও সাহসী হয়, তবে গুণের বিচারে সে ক্ষত্রিয়। এটি মানুষের ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে মর্যাদা দেয়। অর্জুনকে কৃষ্ণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর গুণ ও কর্ম হলো ক্ষত্রিয়ের, তাই যুদ্ধ করাই তাঁর স্বধর্ম। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে কর্মক্ষেত্রের বিভাজন শোষণের জন্য নয়, বরং সমাজের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য।