সরল ভাবার্থ
কর্ম কী এবং অকর্ম কী—এ বিষয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণও (পণ্ডিতগণ) মোহগ্রস্ত হন। অতএব আমি তোমাকে সেই কর্মতত্ত্ব বলব, যা জানলে তুমি অশুভ (সংসার বন্ধন) থেকে মুক্তি লাভ করবে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা
শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি অত্যন্ত কঠিন সমস্যার অবতারণা করেছেন। আমরা সাধারণত মনে করি হাত-পা নাড়িয়ে কিছু করাই হলো 'কর্ম', আর চুপচাপ বসে থাকা হলো 'অকর্ম'। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন, বিষয়টি এত সহজ নয়। এমনকি বড় বড় পণ্ডিত বা 'কবি' (যাঁরা দূরদর্শী) তাঁরাও এই তত্ত্বে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
কেন এই বিভ্রান্তি? কারণ অনেক সময় বাইরে থেকে যা পুণ্য কাজ বলে মনে হয়, তার পেছনে যদি অহংকার থাকে, তবে তা আসলে বন্ধন তৈরি করে। আবার বাইরে থেকে যা কঠোর কাজ মনে হয় (যেমন অর্জুনের যুদ্ধ), তা যদি ভগবানের নির্দেশে হয়, তবে তা মানুষকে মুক্ত করে। অর্জুন যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন যুদ্ধ করাটা পাপ বা অশুভ কর্ম, আর যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়াটা অকর্ম বা পুণ্য। কৃষ্ণ তাকে বলছেন—তোমার ধারণা ভুল।
ধর্মীয় বিচারে, কর্মের গূঢ় রহস্য কেবল শাস্ত্র পড়ে বোঝা যায় না। এটি হৃদয়ের অনুভবের বিষয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে গুরুর ভূমিকা পালন করছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে তিনি অর্জুনকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি দেবেন যা তাকে জীবনের সব 'অশুভ' থেকে রক্ষা করবে। অশুভ মানে এখানে কেবল বিপদ নয়, বরং জন্ম-মৃত্যুর চক্র। এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে কর্ম করার চেয়েও বড় হলো কর্মের পেছনের 'উদ্দেশ্য' বা 'চেতনা' বোঝা। আমরা যদি না জেনে কাজ করি, তবে আমরা অন্ধের মতো ঘুরপাক খাব। সত্যকে জানার প্রথম ধাপ হলো নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করা, যা অর্জুন করেছেন।