যোগী যুঞ্জীত সততমাত্মানং রহসি স্থিতঃ ।
একাকী যতচিত্তাত্মা নিরাশীরপরিগ্রহঃ ॥ ৬.১০ ॥
সরল ভাবার্থ:
যোগী নির্জন স্থানে একাকী অবস্থান করে, মন ও দেহকে সংযত রেখে, আকাঙ্ক্ষাহীন ও সঞ্চয়হীন হয়ে সর্বদা ধ্যানে মগ্ন থাকবেন।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এখান থেকেই ধ্যানের ব্যবহারিক বা প্রাকটিক্যাল নির্দেশনার সূচনা হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ধ্যানের জন্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত তা বর্ণনা করেছেন। এটি আধ্যাত্মিক জীবন গড়ার একটি রোডম্যাপ।
১. নির্জনতা ও একাকীত্বের মাহাত্ম্য: 'রহসি স্থিতঃ' শব্দটির অর্থ নির্জন স্থানে থাকা। কোলাহলপূর্ণ জায়গায় মন বারবার বাইরের বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। ধ্যানের প্রাথমিক স্তরে আমাদের চারপাশ শান্ত হওয়া প্রয়োজন যাতে আমরা নিজের অন্তরের কথা শুনতে পাই। আবার 'একাকী' শব্দটি বোঝায় যে ধ্যানের সময় কারো সাহচর্য নয়, বরং কেবল নিজের আত্মার সাথে সময় কাটানো দরকার। ভিড়ের মাঝে আমরা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হই, কিন্তু একাকীত্বে আমরা আমাদের প্রকৃত স্বরূপের মুখোমুখি হতে পারি। এই নির্জনতা যোগীকে বাইরের জগৎ থেকে বিযুক্ত হয়ে অন্তর্জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
২. মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি: 'যতচিত্তাত্মা' শব্দটি অত্যন্ত গভীর। এর অর্থ হলো যাঁর মন ও বুদ্ধি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। শরীর স্থির না থাকলে যেমন মন স্থির হয় না, তেমনি মন অবাধ্য থাকলে ধ্যানে বসা অসম্ভব। তাই ধ্যানের জন্য শরীর ও মনের একতান হওয়া প্রয়োজন। এর সাথে যোগীকে হতে হবে 'নিরাশী'—অর্থাৎ যাঁর জাগতিক কোনো ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা নেই। কামনা হলো আগুনের মতো, যা মনকে পুড়িয়ে অস্থির করে দেয়। কামনা না থাকলে মন জলের মতো স্বচ্ছ ও স্থির থাকে।
৩. অপরিগ্রহ বা অসংগ্রহ ব্রত: অপরিগ্রহ মানে হলো অপ্রয়োজনীয় বস্তু সঞ্চয় না করা। মানুষ যত বেশি বস্তু সংগ্রহ করে, সেই বস্তুগুলো রক্ষা করার চিন্তায় তাঁর মন তত বেশি ব্যস্ত থাকে। যোগী তাঁর জীবনকে একদম সহজ ও বাহুল্যবর্জিত রাখেন। তাঁর লক্ষ্য হলো 'মিনিমালিজম' বা ন্যূনতম প্রয়োজনে জীবন ধারণ করা। কারণ জিনিসের মায়া মানুষের চেতনার ওপর ভারী হয়ে বসে। 'সতত' শব্দটি মনে করিয়ে দেয় যে যোগ একদিনের কোনো ইভেন্ট নয়, এটি জীবনের প্রতি মুহূর্তের অভ্যাস।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য শৃঙ্খলা অপরিহার্য। নিজেকে জানার জন্য আমাদের মাঝেমধ্যে বাইরের কোলাহল থেকে দূরে যেতে হয়। যখন আমরা কামনা ও সংগ্রহের লোভ ত্যাগ করতে পারি, তখনই আমাদের মন ঈশ্বরের জন্য শূন্য হয় এবং সেখানে ঐশ্বরিক প্রকাশ ঘটে। এটি এক প্রকারের আত্মিক শুদ্ধি যা ধ্যানের মূল ভিত্তি।