॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ২৯ ॥

সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি ।
ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শনঃ ॥ ৬.২৯ ॥

সরল ভাবার্থ:

যাঁর চিত্ত যোগযুক্ত এবং যিনি সর্বত্র সমদর্শী, তিনি নিজের আত্মাকে সমস্ত ভূতে (প্রাণীতে) এবং সমস্ত ভূতকে নিজের আত্মায় দর্শন করেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি অদ্বৈত দর্শনের এবং প্রকৃত মানবতার এক চূড়ান্ত উদাহরণ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সমদর্শনের সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন যা একজন যোগীকে বিশ্বপ্রেমিক করে তোলে।

১. সর্বত্র সমদর্শন: যোগী যখন ধ্যানের গভীরে যান, তখন তাঁর ভেতরের সব ভেদাভেদ ঘুচে যায়। তিনি আর নিজেকে কারো চেয়ে বড় বা ছোট মনে করেন না। 'সমদর্শন' মানে কেবল সমানভাবে দেখা নয়, বরং সবার ভেতরে একই সত্য অনুভব করা। তিনি দেখেন যে যে আত্মা তাঁর শরীরে আছে, সেই একই আত্মা একটি গাছ, একটি পশু বা অন্য একজন মানুষের ভেতরেও আছে। এই দৃষ্টিই হলো আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম শিখর।

২. আত্মার একত্ব অনুভব: শ্রীকৃষ্ণ দুটি অদ্ভুত অবস্থার কথা বলেছেন। প্রথমত, 'সর্বভূতস্থমাত্মানং'—অর্থাৎ নিজেকে সবার মাঝে দেখা। দ্বিতীয়ত, 'সর্বভূতানি চাত্মনি'—অর্থাৎ সবাইকে নিজের মাঝে দেখা। এর অর্থ হলো যোগী নিজের ক্ষুদ্র অহং ত্যাগ করে বিশ্বাত্মার সাথে এক হয়ে যান। তিনি যখন কাউকে কষ্ট পেতে দেখেন, তখন তিনি নিজেও সেই কষ্ট অনুভব করেন। আবার কারোর আনন্দে তিনিও আনন্দিত হন। এই অবস্থায় হিংসা বা দ্বেষ করার কোনো জায়গা থাকে না, কারণ মানুষ নিজেকে নিজে কখনো ঘৃণা করতে পারে না।

৩. যোগযুক্ত আত্মার দৃষ্টি: কেবল পুঁথি পড়ে এই সমদৃষ্টি আসে না। এর জন্য মনকে যোগের মাধ্যমে পবিত্র করতে হয়। যোগী যখন বুঝতে পারেন যে এই জগত ঈশ্বরেরই এক বিশাল রূপান্তর, তখন তিনি জগতের প্রতিটি ধূলিকণাকে শ্রদ্ধা করেন। তাঁর কাছে কোনো কিছুই তুচ্ছ নয়। এই বিশ্বজনীন প্রেমই হলো প্রকৃত ভক্তি। এটি মানুষকে সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এক উদার মানবিকতার পথে নিয়ে যায়।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের অহংকার ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে আমরা সবাই এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। যখন আমরা অন্যকে সাহায্য করি, তখন আসলে আমরা নিজেদেরই সাহায্য করি। এই দৃষ্টি যখন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই প্রকৃত শান্তি আসবে। এটিই হলো সনাতন ধর্মের মূল বাণী—বসুধৈব কুটুম্বকম্।