এতন্মে সংশয়ং কৃষ্ণ ছেত্তুমর্হস্যশেষতঃ ।
ত্বদন্যঃ সংশয়স্যাস্য ছেত্তা ন হ্যুপপদ্যতে ॥ ৬.৩৯ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে কৃষ্ণ! কেবল তুমিই পারো আমার এই সংশয়কে সমূলে নাশ করতে। তুমি ছাড়া আর কেউ এই সংশয় দূর করার যোগ্য নেই।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
অর্জুন এখানে তাঁর সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন। এই শ্লোকটি একজন আদর্শ শিষ্য ও গুরুর মধ্যকার সম্পর্কের গভীরতাকে প্রকাশ করে।
১. সংশয় ছেদনের প্রার্থনা: অর্জুন বুঝতে পারছেন যে তাঁর মনের এই সংশয়টি কোনো সাধারণ যুক্তি দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এটি জীবনের ওপারকার বিষয়, যা কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব। তাই তিনি বলছেন ‘অশেষতঃ’—অর্থাৎ পুরোপুরি বা সমূলে নাশ করার জন্য। অর্ধেক জ্ঞান বা অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে এগোনো যায় না। সংশয় হলো মনের বিষের মতো, যা ভেতরে থাকলে কোনো শান্তি পাওয়া যায় না। অর্জুন চান তাঁর মন যেন আয়নার মতো পরিষ্কার হয় যাতে তিনি কৃষ্ণের উপদেশগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন।
২. কৃষ্ণের অনন্যতা: অর্জুন কৃষ্ণকে ‘ত্বদন্যঃ’ অর্থাৎ তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানেন যে কৃষ্ণ কেবল তাঁর সারথি নন, তিনি হলেন ‘যোগেশ্বর’। কৃষ্ণ কাল ও মহাকালের ঊর্ধ্বে, তিনি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব জানেন। কোনো মহর্ষি বা দেবতাও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না যা কৃষ্ণ দিতে পারেন। আমাদের জীবনেও যখন কোনো গভীর আধ্যাত্মিক সংকট আসে, তখন আমাদের উচিত শাস্ত্র এবং এমন একজন গুরুর শরণাপন্ন হওয়া যাঁর বাক্য অকাট্য। অর্জুনের এই বিশ্বাসই প্রমাণ করে যে তিনি সত্যই জ্ঞানের যোগ্য অধিকারী।
৩. গুরুর প্রয়োজনীতা: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা কোনো ইউটিউব ভিডিও দেখে বা কেবল বই পড়ে শেখার বিষয় নয়। এর জন্য এমন একজন শক্তির প্রয়োজন যিনি আমাদের মনের অন্ধকার দূর করতে পারেন। অর্জুন এখানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন। এটি বিনয়। এই বিনয় ছাড়া ঈশ্বরীয় জ্ঞান লাভ করা যায় না। যখন শিষ্য বলে ‘আমি জানি না, তুমিই কেবল জানো’, তখনই গুরুর কৃপা বর্ষিত হয়। অর্জুনের এই আকুলতা আমাদের সবার জন্য একটি উদাহরণ যে কীভাবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে হয়।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের ভক্তি ও বিশ্বাসের শক্তি শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যখনই বিভ্রান্ত হবো, আমাদের উচিত কৃষ্ণের চরণে নিজেকে সমর্পণ করা। কারণ তিনিই পরম আলোকবর্তিকা যা সব অন্ধকার দূর করতে পারে। সংশয় নিয়ে সাধনা করা যায় না, আর সেই সংশয় কাটার একমাত্র উপায় হলো পরমাত্মার চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া। অর্জুনের এই সমর্পণই গীতার পরবর্তী মহান উপদেশগুলোর পথ প্রশস্ত করেছে।