॥ অধ্যায় ৬, শ্লোক ৪৪ ॥

পূর্বাভ্যাসেন তেনৈব হ্রিয়তে হ্যবশোঽপি সঃ ।
জিজ্ঞাসুরপি যোগস্য শব্দব্রহ্মাতিবর্ততে ॥ ৬.৪৪ ॥

সরল ভাবার্থ:

সেই পূর্বজন্মের অভ্যাসের ফলেই তিনি যেন এক অলৌকিক আকর্ষণে যোগের দিকে ধাবিত হন। যোগের বিষয়ে সামান্য কৌতূহলী ব্যক্তিও বেদে বর্ণিত সकाम কর্মের ফলকে অতিক্রম করে যান।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এই শ্লোকটি আধ্যাত্মিক আকর্ষণের এক অতিপ্রাকৃত ও বৈজ্ঞানিক দিক তুলে ধরেছে। কেন কেউ কোনো কারণ ছাড়াই ভগবানের দিকে টান অনুভব করে, তার ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়।

১. অদৃশ্য টান বা ‘অবশ’ আকর্ষণ: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন ‘হ্রিয়তে হ্যবশোঽপি’—অর্থাৎ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বা যেন কেউ তাঁকে জোর করে ধর্মের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় কেউ নাস্তিক পরিবারে জন্মেও পরম ভক্ত হয়ে ওঠে। এটি কেন হয়? কারণ তাঁর পূর্বজন্মের অভ্যাস তাঁকে ঘরে থাকতে দেয় না। যেমন লোহা চুম্বকের টানে আপনিই চলে আসে, তেমনি তাঁর ভেতরের আধ্যাত্মিক সংস্কার তাঁকে জগতের কোলাহল থেকে সরিয়ে শান্ত তপোবনে বা মন্দিরে নিয়ে যায়। এই অদৃশ্য টানই প্রমাণ করে যে আমরা আমাদের অতীতের কর্মের ফল।

২. শব্দব্রহ্ম অতিক্রম: বেদে বর্ণিত যাগযজ্ঞ, স্বর্গলাভ এবং জাগতিক উন্নতির ফলকে বলা হয় ‘শব্দব্রহ্ম’। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যে ব্যক্তি কেবল মনে মনে যোগের প্রতি একটু কৌতূহল বা ‘জিজ্ঞাসা’ রাখে, সেও ওই সব বিশাল বিশাল কর্মকাণ্ডের ফলের চেয়ে বেশি লাভ করে। কারণ যোগ হলো অন্তরের পবিত্রতা, আর যজ্ঞ হলো বাহ্যিক আচার। মনকে শুদ্ধ করার যে কোনো ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাও হাজার যজ্ঞের চেয়ে মূল্যবান। এটি ধর্মের এক উদার ও সহজ রূপ। কৃষ্ণ এখানে রিচুয়ালের চেয়ে রিলাইজেশন বা উপলব্ধি-কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

৩. আশা ও বিশ্বাসের বাণী: এই শ্লোকটি প্রতিটি মানুষের জন্য আশা জাগানিয়া। আপনি হয়তো আজ পূর্ণ যোগী নন, কিন্তু আপনার মনে যদি একটুও ইচ্ছা থাকে যে—‘আমি ঈশ্বরকে জানতে চাই’, তবে জেনে রাখুন আপনি সাধারণ মানুষদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন। আপনার এই ছোট ইচ্ছাই আপনাকে একদিন পরম লক্ষ্যে নিয়ে যাবে। আমাদের কাজ হলো কেবল সেই ইচ্ছার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখা। বাকি কাজ ঈশ্বর বা আমাদের পূর্বজন্মের সংস্কার নিজেই করে দেবে। এটি এক প্রকারের আধ্যাত্মিক অটোমেশন যেখানে একবার ইঞ্জিন স্টার্ট হলে যাত্রা চলতেই থাকে।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের আন্তরিকতার গুরুত্ব শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর কেবল বাইরের ভক্তি দেখেন না, তিনি দেখেন আমাদের ভেতরের তৃষ্ণা। যখন আমরা সত্যই তাঁকে খুঁজি, তখন জগত আমাদের আটকে রাখতে পারে না। এই অটল আকর্ষণই আমাদের মুক্তির গ্যারান্টি। এটি আমাদের শেখায় যে ধর্মের পথে ছোট এক পা বাড়ানোও মহৎ প্রাপ্তির সূচনা করতে পারে।