॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ২৭ ॥

ইচ্ছাদ্বেষসমুত্থেন দ্বন্দ্বমোহেন ভারত ।
সর্বভূতানি সম্মোহং সর্গে যান্তি পরন্তপ ॥ ৭.২৭ ॥

সরল ভাবার্থ:

হে ভরতবংশীয় পরন্তপ অর্জুন! ইচ্ছা ও দ্বেষ থেকে উৎপন্ন দ্বন্দ্বের মোহে পড়ে এই জগতের সমস্ত প্রাণী জন্মের সময় থেকেই মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকে।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

কেন মানুষ জন্মের পর থেকেই ঈশ্বরকে ভুলে যায়? কেন আমরা সবসময় অস্থির থাকি? শ্রীকৃষ্ণ এখানে মানুষের মনস্তত্ত্বের মূল জটটি খুলে দিয়েছেন।

১. ইচ্ছা ও দ্বেষ: আমাদের মনের দুটি প্রধান শত্রু হলো—যা ভালো লাগে তা পাওয়ার ‘ইচ্ছা’ এবং যা খারাপ লাগে তা দূর করার ‘দ্বেষ’ বা ঘৃণা। এই চাওয়া-পাওয়ার খেলায় আমাদের মন সবসময় ব্যস্ত থাকে। আমরা হয় সুখে ভাসি, নয়তো দুঃখে ডুবি। এই দ্বৈততাই আমাদের স্থিতপ্রজ্ঞ হতে দেয় না। এটি আমাদের আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে ভুলিয়ে রাখে।

২. দ্বন্দ্বমোহ: জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতি, শীত-উষ্ণ—এই সব ‘দ্বন্দ্ব’ আমাদের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমরা মনে করি জগত কেবল ভোগের জন্য। এই ভ্রান্ত ধারণাই হলো ‘সম্মোহং’। জন্মের পর থেকেই পরিবেশ আমাদের শেখায় যে শরীরই সব। ফলে আমরা আমাদের পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণকে চিনতে পারি না। এটি এক প্রকারের জন্মগত মায়া।

৩. পরন্তপ সম্বোধন: কৃষ্ণ অর্জুনকে ‘শত্রু দমনকারী’ (পরন্তপ) বলে ডাকছেন। তিনি তাঁকে উৎসাহিত করছেন যেন অর্জুন তাঁর ভেতরের এই ইচ্ছা ও দ্বেষ নামক শত্রুগুলোকেও দমন করেন। এই যুদ্ধ বাইরের যুদ্ধের চেয়েও বড়। আমাদের মনের এই মোহ কাটিয়ে উঠতে পারলেই আমরা প্রকৃত জ্ঞানের পথে এগোতে পারি।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে জগত আমাদের মায়ায় ফেলার জন্য তৈরি। আমাদের কাজ হলো এই ইচ্ছা-দ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে মনকে শান্ত রাখা। যখন মন শান্ত হয় এবং কোনো কিছুতেই আসক্ত থাকে না, তখনই ঈশ্বরের আলো সেখানে প্রতিফলিত হয়। এটি মুক্তির প্রথম শর্ত।