॥ শ্লোক ৭.১ ॥ (শ্রীভগবান্ উবাচ)
ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্ মদাশ্রয়ঃ ।
অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু ॥
অনুবাদ: শ্রীভগবান্ বললেন—হে পার্থ, তুমি মদ্গতচিত্ত, মদাশ্রয়ী হয়ে যোগ অনুশীলন করতে করতে যেভাবে নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণরূপে আমাকে জানতে পারবে, তা শ্রবণ কর।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২ ॥
জ্ঞানং তেঽহং সবিজ্ঞানম্ ইদং বক্ষ্যাম্যশেষতঃ ।
যজ্ জ্ঞাত্বা নেহ ভূয়োঽন্যজ্ জ্ঞাতব্যম্ অবশিষ্যতে ॥
অনুবাদ: আমি তোমাকে বিজ্ঞান-সহ এই জ্ঞান সম্পূর্ণভাবে বলব, যা জানলে এই জগতে আর কিছুই জানার অবশিষ্ট থাকবে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৩ ॥
মনুষ্যাণাং সহস্রেযু কশ্চিদ্ যততি সিদ্ধয়ে ।
যততাম্ অপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্ মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ ॥
অনুবাদ: হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কোনো একজন সিদ্ধি লাভের জন্য যত্ন করে। আর যারা সিদ্ধিলাভের জন্য যত্নশীল, তাদের মধ্যেও কোনো একজনই আমাকে যথার্থরূপে জানতে পারে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৪ ॥
ভূমির্ আপোঽনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধির্ এব চ ।
অহঙ্কার ইতীয়ং মে ভিন্না প্রকৃতির্ অষ্টধা ॥
অনুবাদ: ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার—এই আট প্রকারে আমার প্রকৃতি বিভক্ত।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৫ ॥
অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্ ।
জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ ॥
অনুবাদ: হে মহাবাহো, এই সমস্ত (আট প্রকার) প্রকৃতি ছাড়াও আমার আর একটি শ্রেষ্ঠ প্রকৃতি রয়েছে। এই প্রকৃতি জীবস্বরূপা এবং এই জগৎ তারই দ্বারা ধারণ করা আছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৬ ॥
এতদযোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্য়ুপধারয় ।
অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্ তথা ॥
অনুবাদ: তুমি নিশ্চয় জানো যে, এই দুই প্রকৃতি থেকেই সমস্ত প্রাণী উৎপন্ন হয়। আমিই সমগ্র জগতের উৎপত্তি ও বিনাশের কারণ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৭ ॥
মত্তঃ পরতরং নান্যত্ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় ।
ময়ি সর্বম্ ইদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব ॥
অনুবাদ: হে ধনঞ্জয়, আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই। সূত্রে যেমন মণিগুলি গাঁথা থাকে, তেমনই এই সমস্ত জগৎ আমাতে গ্রথিত হয়ে আছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৮ ॥
রসোঽহম্ অপ্সু কৌন্তেয় প্রভাঽস্মি শশি সূর্যয়োঃ ।
প্রণবঃ সর্ব বেদেযু শব্দঃ খে পৌরুষং নৃষু ॥
অনুবাদ: হে কৌন্তেয়, আমি জলে রস, চন্দ্র ও সূর্যের প্রভা, সমস্ত বেদে ওঁকার (প্রণব), আকাশে শব্দ এবং পুরুষে পৌরুষ (পুরুষত্ব)।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৯ ॥
পুণ্যো গন্ধঃ পৃথিব্যাং চ তেজশ্চাস্মি বিভাবসৌ ।
জীবনং সর্বভূতেষু তপশ্চাস্মি তপস্বিষু ॥
অনুবাদ: আমি পৃথিবীতে পবিত্র গন্ধ, অগ্নিতে তেজ, সমস্ত প্রাণীর জীবন এবং তপস্বীদের মধ্যে তপস্যা।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১০ ॥
বীজং মাং সর্বভূতানাং বিদ্ধি পার্থ সনাতনম্।
বুদ্ধির্বুদ্ধিমতামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্ ॥
অনুবাদ: হে পার্থ, আমাকেই সর্বভূতের সনাতন বীজ বলিয়া জানিও। আমি বুদ্ধিমানদের বুদ্ধি এবং তেজস্বীদিগের তেজ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১১ ॥
বলং বলবতাম্ অস্মি কামরাগবিবর্জিতম্ ।
ধর্মা বিরুদ্ধো ভূতেষু কামোঽস্মি ভরতর্ষভ ॥
অনুবাদ: আমি বলবানদের কাম ও রাগ বর্জিত বল, এবং হে ভরতশ্রেষ্ঠ, আমি প্রাণীদের মধ্যে ধর্মানুমোদিত কাম।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১২ ॥
যে চৈব সাত্ত্বিকা ভাবা রাজসাস্তামসাশ্চ যে।
মত্ত এবেতি তান্ বিদ্ধি ন ত্বহং তেষু তে ময়ি।।
অনুবাদ: আর যা কিছু সাত্ত্বিক ভাব, রাজসিক ভাব এবং তামসিক ভাব রয়েছে, তুমি তাদের আমার থেকেই উৎপন্ন বলে জানো। যদিও তারা আমা থেকে উৎপন্ন, তথাপি আমি তাদের মধ্যে নেই, বরং তারা আমাতে আছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৩ ॥
ত্রিভির্গুণময়ৈর্ভাবৈরেভিঃ সর্বমিদং জগৎ।
মোহিতং নাভি জানাতি মামেভ্যঃ পরম্ অব্যয়ম্ ॥
অনুবাদ: এই ত্রিগুণময় ভাবসমূহ দ্বারা এই সমস্ত জগৎ মোহিত হয়ে আছে, তাই তারা এই সকল গুণের অতীত অব্যয়স্বরূপ আমাকে জানতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৪ ॥
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া ।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥
অনুবাদ: যেহেতু এই গুণময়ী আমার দৈবী মায়া (শক্তি) দুস্তর, তাই যাঁরা আমারই শরণাপন্ন হন, তাঁরাই এই মায়া অতিক্রম করতে পারেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৫ ॥
ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়া প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবম্ আশ্রিতাঃ ॥
অনুবাদ: দুষ্কৃতকারী মূঢ় ও নরাধম ব্যক্তিরা আমার শরণাপন্ন হয় না; কারণ মায়ার দ্বারা তাদের জ্ঞান হরণ করা হয়েছে এবং তারা আসুরিক ভাব অবলম্বন করেছে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৬ ॥
চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোঽর্জুন ।
আর্তো জিজ্ঞাসুরর্থার্থী জ্ঞানী চ ভরতর্ষভ ॥
অনুবাদ: হে অর্জুন, চার প্রকারের সুকৃতিসম্পন্ন ব্যক্তি আমাকে ভজনা করে— আর্ত (দুঃখে কাতর), জিজ্ঞাসু (জানতে ইচ্ছুক), অর্থার্থী (ধনকামী) এবং জ্ঞানী।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৭ ॥
তেষাং জ্ঞানী নিত্য যুক্ত একভক্তির্ বিশিষ্যতে ।
প্রিয়ো হি জ্ঞানিনোঽত্য়র্থম্ অহং স চ মম প্রিয়ঃ ॥
অনুবাদ: এঁদের মধ্যে যিনি জ্ঞানী, যিনি নিত্য যুক্ত এবং একনিষ্ঠ ভক্তিমান্, তিনিই শ্রেষ্ঠ। কারণ আমি জ্ঞানীর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং তিনিও আমার অতিশয় প্রিয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৮ ॥
উদারাঃ সর্ব এবৈতে জ্ঞানী ত্ব্ আত্মৈব মে মতম্ ।
আস্থিতঃ স হি যুক্তাত্মা মামেবানুত্তমাং গতিম্ ॥
অনুবাদ: যদিও এঁরা সকলেই উদার, তবুও জ্ঞানীকে আমি আমার আত্মার মতো মনে করি। কারণ সেই স্থিতচিত্ত জ্ঞানী আমাকেই শ্রেষ্ঠ গতি বা আশ্রয় হিসেবে অবলম্বন করেছেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.১৯ ॥
বহূনাং জন্মনাম্ অন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে ।
বাসুদেবঃ সর্বম্ ইতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ ॥
অনুবাদ: বহু জন্মের পর, জ্ঞানবান্ ব্যক্তি 'বাসুদেবই সবকিছু' এই জেনে আমার শরণাপন্ন হন। সেই মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২০ ॥
কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ ।
তং তং নিয়মম্ আস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া ॥
অনুবাদ: যাঁদের জ্ঞান নানা কামনা দ্বারা হৃত (দূরীভূত) হয়েছে, তাঁরা নিজ স্বভাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে সেই সেই নিয়ম অবলম্বনপূর্বক অন্য দেবতাদের শরণাপন্ন হন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২১ ॥
যো যো যাং তনুং ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ার্চিতুমিচ্ছতি ।
তস্য তস্যা চলাং শ্রদ্ধাং তামেব বিদধাম্য্ অহম্ ॥
অনুবাদ: যে যে ভক্ত শ্রদ্ধার সাথে যে যে দেবতার মূর্তি পূজা করতে ইচ্ছা করে, আমি সেই সেই ভক্তের সেই সেই মূর্তিতে অচলা শ্রদ্ধা বিধান করি।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২২ ॥
স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্ তস্যারাধনম্ ঈহতে ।
লভতে চ ততঃ কামান্ ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্ ॥
অনুবাদ: সেই ভক্ত সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই দেবতার আরাধনা করতে চেষ্টা করে এবং সেই দেবতা থেকে আমারই দ্বারা বিহিত (নির্ধারিত) তার অভীষ্ট ফল লাভ করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৩ ॥
অন্তবত্ তু ফলং তেষাং তদ্ ভবত্যল্পমেধসাম্ ।
দেবান্ দেবয়জো য়ান্তি মদ্ ভক্তা য়ান্তি মাম্ অপি ॥
অনুবাদ: কিন্তু সেই অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিদের সেই ফল ক্ষণস্থায়ী বা বিনাশী হয়। দেবপূজাকারীরা দেবলোক প্রাপ্ত হন, আর আমার ভক্তরা আমাকেই লাভ করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৪ ॥
অব্যক্তং ব্যক্তিম্ আপন্নং মন্যন্তে মাম্ অবুদ্ধয়ঃ ।
পরং ভাবম্ অজানন্তো মমাব্য়য়ম্ অনুত্তমম্ ॥
অনুবাদ: আমার অব্যয় ও অনুত্তম পরভাব না জানার কারণে, অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিরা আমাকে অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত (শরীরী) বলে মনে করে।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৫ ॥
নাহং প্রকাশঃ সর্বস্য যোগমায়া সমাবৃতঃ ।
মূঢ়োঽয়ং নাভি জানাতি লোকো মাম্ অজম্ অব্যয়ম্ ॥
অনুবাদ: আমি যোগমায়ার দ্বারা আবৃত থাকায় সকলের কাছে প্রকাশিত হই না। তাই এই মূঢ় জগৎ আমাকে জন্মরহিত ও অব্যয় বলে জানতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৬ ॥
বেদা হং সমতীতানি বর্ত্তমানানি চার্জুন ।
ভবিষ্যৎ তানি চ ভূতানি মাং তু বেদ ন কশ্চন ॥
অনুবাদ: হে অর্জুন, আমি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল প্রাণীকেই জানি, কিন্তু আমাকে কেউ জানতে পারে না।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৭ ॥
ইচ্ছাদ্বেষসমুত্থেন দ্বন্দ্বমোহেন ভারত ।
সর্বভূতানি সংমোহং য়ান্তি পরন্তপ ॥
অনুবাদ: হে ভারত, হে পরন্তপ, ইচ্ছাশক্তি ও দ্বেষ থেকে উৎপন্ন দ্বন্দ্ব-মোহের কারণে সমস্ত প্রাণী বারবার মোহগ্রস্ত হয়।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৮ ॥
যেষাং ত্ব্ অন্তগতং পাপং জনানাং পুণ্যকর্মণাম্ ।
তে দ্বন্দ্ব মোহ নির্মুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতাঃ ॥
অনুবাদ: কিন্তু সেই পুণ্যকর্মকারী ব্যক্তিদের পাপ যখন সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়, তখন তাঁরা দ্বন্দ্ব-মোহ থেকে মুক্ত হয়ে দৃঢ় সংকল্পের সাথে আমাকে ভজনা করেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.২৯ ॥
জরা মরণ মোক্ষায় মাম্ আশ্রিত্য য়তন্তি য়ে ।
তে ব্রহ্ম তদ্ বিদুঃ কৃৎস্নম্ অধ্যাত্মং কর্ম চাখিলম্ ॥
অনুবাদ: যাঁরা জরা (বার্ধক্য) ও মরণ থেকে মুক্তি লাভের জন্য আমাকে আশ্রয় করে যত্ন করেন, তাঁরা সেই ব্রহ্ম, সম্পূর্ণ অধ্যাত্ম এবং অখিল কর্মকে জানেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ শ্লোক ৭.৩০ ॥
সাধিভূতাধিদৈবং মাং সাধিযজ্ঞং চ য়ে বিদুঃ ।
প্রয়াণকালেঽপি চ মাং তে বিদুর্ যুক্তচেতসঃ ॥
অনুবাদ: যাঁরা অধিভূত, অধিদৈব এবং অধিযজ্ঞ সহ আমাকে জানেন, তাঁরা যুক্তচিত্ত হয়ে মৃত্যুকালেও আমাকে জানতে পারেন।
বাংলা ব্যাখ্যা
॥ ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসু উপনিষত্সু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে জ্ঞান-বিজ্ঞান-যোগ নাম সপ্তমঅধ্যায় ॥
এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা উপনিষদের ব্রহ্মবিদ্যা এবং যোগশাস্ত্রের অন্তর্গত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সংবাদে 'জ্ঞান-বিজ্ঞান-যোগ' নামক সপ্তম অধ্যায় সমাপ্ত হলো।