মত্তঃ পরতরং নান্যৎকিঞ্চিদন্তি ধনঞ্জয় ।
ময়ি সর্বমিদং প্রোতং মণিগণ ইব সূত্রে ॥ ৭.৭ ॥
সরল ভাবার্থ:
হে ধনঞ্জয়! আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই। সুতোয় গাঁথা মণিগুলোর মতো এই সমগ্র জগত আমাতেই ওতপ্রোতভাবে গেঁথে আছে।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপমা বহন করে। এটি ঈশ্বর ও তাঁর সৃষ্টির সম্পর্ককে এক নিমেষে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে।
১. মণি ও সূত্রের উপমা: আমরা যখন একটি সুন্দর মালার দিকে তাকাই, আমরা বড় বড় মণিগুলোই দেখি। কিন্তু সেই মণিগুলোকে যে একটি সুতো ধরে রেখেছে, তা বাইরে থেকে দেখা যায় না। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে জগত হলো সেই মালার মতো আর তিনি হলেন সেই অদৃশ্য সুতো। সুতো না থাকলে মণিগুলো যেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেত, তেমনি কৃষ্ণ না থাকলে জগতের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। তিনি এই জগতের অদৃশ্য আধার।
২. মত্তঃ পরতরং নান্যৎ: কৃষ্ণ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছেন যে তাঁর উপরে কোনো সত্য নেই। তিনি ‘পরম সত্য’। অনেক সময় আমরা মনে করি দেবতারা আলাদা বা শক্তি আলাদা, কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন সবকিছুই তাঁর ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি সব শক্তির উৎস। ধনঞ্জয় (অর্জুন) যেমন যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন, কৃষ্ণ তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে সেই জয়ের শক্তিও আসলে কৃষ্ণেরই দেওয়া।
৩. সর্বব্যাপ্ততা: এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে ঈশ্বর কোথাও দূরে আকাশবাসে নেই। তিনি সৃষ্টির প্রতিটি রন্ধ্রে মিশে আছেন। আমরা যে জগত দেখছি, তা তাঁরই এক বিশাল রূপান্তর। এই উপলব্ধি যখন মানুষের হয়, তখন সে আর একাকীত্ব বোধ করে না। সে জানে যে সে সবসময় ভগবানের সাথে যুক্ত আছে।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের বিনয় শেখায়। আমরা যখন আমাদের বড় বড় সাফল্য দেখি, তখন যেন ভুলে না যাই যে পেছনের অদৃশ্য সুতোটি কে। এটি আমাদের একত্ববোধের শিক্ষা দেয়। আমরা সবাই আলাদা আলাদা মণি হতে পারি, কিন্তু আমাদের ভেতরে থাকা প্রাণশক্তি সেই একই সুতোয় গাঁথা। এটিই হলো প্রকৃত সৌভ্রাতৃত্বের ভিত্তি।