ত্রিভিরগুণময়ৈর্ভাবৈরেভিঃ সর্বমিদং জগৎ ।
মোহিতং নাভিজানাতি মামেভ্যঃ পরমব্যয়ম্ ॥ ৭.১৩ ॥
সরল ভাবার্থ:
সত্ত্ব, রজ ও তম—এই ত্রিগুণের দ্বারা এই সমগ্র জগত মোহিত হয়ে আছে। তাই এই গুণের অতীত যে আমি অবিনাশী পুরুষ, জগত আমাকে চিনতে পারে না।
বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:
কেন মানুষ চোখের সামনে ভগবানকে দেখতে পায় না? কেন জগত এত অস্থির? শ্রীকৃষ্ণ এখানে তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এটি হলো ‘মায়া’র প্রভাব।
১. মায়ার প্রভাব বা মোহ: জগত হলো একটি বড় থিয়েটারের মতো যেখানে সত্ত্ব, রজ ও তম গুণের নানা নাটক চলছে। মানুষ এই অভিনয়ের মোহে এতটাই অন্ধ যে সে এর পেছনের পরিচালককে দেখতে পায় না। আমরা আমাদের সম্পর্ক, সম্পত্তি এবং ছোট ছোট আবেগের মোহে ভগবানকে ভুলে থাকি। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে এই ত্রিগুণ মানুষকে এক মায়ার জালে আটকে রেখেছে।
২. পরম অব্যয় স্বরূপ: কৃষ্ণ নিজেকে ‘পরমব্যয়ম্’ বা অবিনাশী বলেছেন। জগত পরিবর্তনশীল, আজ যা আছে কাল তা নেই। কিন্তু এই পরিবর্তনশীল জগতের পেছনে এক অপরিবর্তনীয় সত্য আছে। আমরা কেবল মরণশীল জিনিসগুলোই দেখতে পাই, কিন্তু অমর সেই সত্তাকে দেখতে পাই না। এই অদৃষ্টিই হলো মানুষের আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব।
৩. চেনার উপায়: এই মোহ থেকে মুক্তি না পেলে পরমাত্মাকে চেনা সম্ভব নয়। আমরা যখন জগতের গুণের অতীত হয়ে ধ্যানের গভীরে যাই, তখনই সেই অবিনাশী স্বরূপের ঝলক পাওয়া যায়। এই শ্লোকটি আমাদের সতর্ক করে যে আমরা যেন এই ক্ষণস্থায়ী মায়ার মরীচিকার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে আসল সত্যকে হারিয়ে না ফেলি।
ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের সজাগ থাকার শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের চারপাশের জগত কেবল একটি পর্দা। পর্দা সরলে তবেই আসল রূপ দেখা যাবে। ভক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে এই মোহ দূর করাই হলো জীবনের আসল চ্যালেঞ্জ। এটি জানলে মানুষের মনে বৈরাগ্য এবং সত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মায়।