॥ অধ্যায় ৭, শ্লোক ১৪ ॥

দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুস্ত্যজয়া ।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥ ৭.১৪ ॥

সরল ভাবার্থ:

আমার এই ত্রিগুণময়ী দৈবী মায়া অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু যারা কেবল আমারই শরণাপন্ন হন, তাঁরাই এই মায়া অনায়াসেই পার হতে পারেন।

বিস্তারিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা:

এটি গীতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বহু আলোচিত শ্লোক। এখানে মায়ার হাত থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকরী ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে—‘শরণাগতি’।

১. মায়ার দুর্ভেদ্যতা: ‘দুস্ত্যজয়া’—এর অর্থ হলো যা ত্যাগ করা বা জয় করা প্রায় অসম্ভব। নিজের শক্তিতে মায়াকে জয় করা অসম্ভব কারণ মায়া স্বয়ং ঈশ্বরেরই শক্তি। এটি এত সূক্ষ্ম যে জ্ঞানী লোকেরাও এর জালে জড়িয়ে পড়েন। আমাদের ইচ্ছা, আবেগ এবং আসক্তি এই মায়ারই অংশ। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ যেমন সাতারু টেনে নিয়ে যায়, মায়াও তেমনি আমাদের ভবসাথী করে রাখে।

২. শরণাগতির শক্তি: শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে মায়াকে জয় করার কোনো শর্টকাট নেই, কিন্তু একটি মাত্র রাস্তা আছে—‘মামেব যে প্রপদ্যন্তে’। অর্থাৎ যারা কৃষ্ণের চরণে নিজেকে সঁপে দেয়। যেমন ছোট শিশু যখন মার হাত ধরে রাস্তা পার হয়, তখন তার পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। তেমনি যখন আমরা ভগবানের হাত ধরি, তখন তাঁরই মায়া আমাদের আর স্পর্শ করতে পারে না। তিনি নিজেই আমাদের মায়া পার করে দেন।

৩. মায়া অতিক্রম বা তরণ: মায়া পার হওয়া মানে জগত ছেড়ে পালানো নয়, বরং জগতে থেকেও অখণ্ড শান্তিতে থাকা। সমুদ্র পার হওয়া যেমন নৌকার ওপর নির্ভর করে, মায়া পার হওয়া তেমনি ভক্তির ওপর নির্ভর করে। এই শ্লোকটি আমাদের নিরহংকার হতে শেখায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একা এই যুদ্ধে জিততে পারব না, আমাদের পরমেশ্বরের সাহায্য প্রয়োজন।

ধর্মীয় বিচারে, এই শ্লোকটি আমাদের ‘প্রপত্তি’ বা পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে ভক্তিই হলো মায়ার অন্ধকার থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ প্রদীপ। যখন আমরা সবকিছু কৃষ্ণে অর্পণ করি, তখন জগতের জটিলতা আমাদের আর বিচলিত করতে পারে না। এটি পরম নিরাপত্তার এক অনুভূতি।